আবার শুরু জগদ্দল বিহারের খনন, বরাদ্দ মাত্র লাখ টাকা

নওগাঁর ঐতিহাসিক প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ধামইরহাটের জগদ্দল বিহারের পুনঃখনন কাজ শুরু করা হয়েছে। 

শনিবার (১১ ফেব্রুয়ারি) বেলা ১১টায় খনন কাজের উদ্বোধন করেন জাতীয় সংসদের আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সভাপতি ও সাবেক হুইপ মো. শহীদুজ্জামান সরকার এমপি।

এ সময় প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মহাপরিচালক চন্দন কুমার দে, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মো. আতাউর রহমান, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের রংপুর ও রাজশাহী রিজিওনালের আঞ্চলিক পরিচালক ড. নাহিদ সুলতানা, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আজাহার আলী, ইউএনও আরিফুল ইসলাম, পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহারের কাস্টডিয়ান ফজলুল করিম আরজুসহ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাবৃন্দ, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। 

এসময় এমপি শহীদুজ্জামান সরকার বলেন, ইতিমধ্যে ধামইরহাট জগদ্দল বিহারে ছোট একটি মিউজিয়ামের প্রস্তাব দিয়েছি। এটি বাস্তবায়ন হলে আমরা বরেন্দ্র অঞ্চলের প্রকৃতি ও তার প্রাণ ফিরে পাবো।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মহাপরিচালক চন্দন কুমার দে বলেন, সারাদেশে আমাদের প্রায় পাঁচ শতাধিক প্রত্নতত্ত্ব  নিদর্শন এলাকা রয়েছে, যার সিংহভাগই অরক্ষিত। আমরা তা সংরক্ষণে কাজ করছি।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালক ড. নাহিদ সুলতানা জানান, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতায় প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আওতায় এক লাখ টাকা বরাদ্দে প্রাথমিকভাবে এক মাস খনন ও গবেষণা চলবে। পরে চাহিদা অনুযায়ী আরও পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। 

স্থানীয়রা জানান, এর আগে ২০০০, ২০১৩ ও ২০১৪ সালে খনন করে বেশ কিছু মূল্যবান নির্দশন পাওয়া গেলেও এই বিহার উৎখননে আর বড়ো কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। বহুদিন পর আবারও এই উদ্যোগ কতখানি সফল হবে তা বলা মুশকিল।

তাদের দাবি, বড়ো পরিসরে উদ্যোগ নিলে অবশ্যই মাটিচাপা পড়া পাল সম্রাট রামপালের রাজধানী রামাবতীর সন্ধান মিলে যেতে পারে এ জগদ্দল বৌদ্ধ বিহারে।

জানা গেছে, একাদশ শতকে বিদ্রোহী বঙ্গাল সৈন্য কর্তৃক পাহাড়পুর (সোমপুর) বিহার আক্রান্ত ও অগ্নিদগ্ধ হয়। এই বিশৃঙ্খলা এবং বাইরের আক্রমণের ফলে পাল সাম্রাজের সার্বভৌমত্ব লুণ্ঠন হয়ে যায়। বরেন্দ্র অঞ্চল কিছু কালের জন্য স্থানীয় কৈবত নায়েব দিব্যোক এবং তার ভ্রাতুষ্পুত্র ভীমের শাসনাধীনে চলে যায়। একাদশ শতকের শেষ দিকে ভীমকে পরাজিত করে রামপাল প্রিয় পিতৃভূমি বরেন্দ্র উদ্ধার করেন। 

এরপর তিনি প্রজাদের অকুণ্ঠ ভালোবাসা অর্জনে মালদহের কাছে রামাবতী নামক রাজধানী এবং এর  কাছে জগদ্দল মহাবিহার (বিশ্ববিদ্যালয়) প্রতিষ্ঠা করেন। 

এই বিহারে খ্যাতনামা বিদগ্ধ পণ্ডিতরা শিক্ষা দান ও গবেষণার কাজে নিয়োজিত ছিলেন। তাদের মধ্যে বিভূতিচন্দ্র হলেন একাধারে গ্রন্থাকার, টিকাকার, অনুবাদক ও সংশোধক। 

স্থানীয়রা জানান, জগদ্দল বৌদ্ধ বিহারের ইতিহাস অনেক পুরনো। বৌদ্ধ বিহারটির মধ্যে জলভরা একটি কুয়া দেখেছি। সময়ের পরিবর্তনে কুয়াটি মাটির আস্তরণে ঢেকে গেছে। বৌদ্ধ বিহারটির আশপাশে কয়েকটি পুরনো দীঘি রয়েছে। 

স্থানীয়রা জানান, আনুমানিক ২০০০ সালে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের লোকজন এসে এই বিহারের পশ্চিম প্রান্তে আংশিকভাবে খনন কাজ শুরু করেন। তারপর থেকে এই অবধি বিহারের অংশভাগ এখনও অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এখানে আংশিক খনন কালে বহু মূল্যবান প্রত্নতত্ত্ব সম্পদ পাওয়া যায়। এখান থেকে সংগৃহীত মূল্যবান প্রত্নসম্পদ ও উপকরণগুলো প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার জাদুঘরে আর কিছু অংশ রাজশাহীতে সংরক্ষণের জন্য নিয়ে যায়। ইউনেস্কো ও ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের সম্ভাব্য তালিকায় জগদ্দল মহাবিহারের নাম রয়েছে। 

তারা জানান, ২০১৩ সালে বিহারের খননে জগদ্দল বিহারের পশ্চিম বাহুর একটি খনন করতে গিয়ে একটি সুরঙ্গের মধ্যে ১৩টি ব্রোঞ্জের বৌদ্ধ মূর্তি পাওয়া যায়।

এদিকে প্রত্নতাত্ত্বিকদের ধারণা, জগদ্দল বিহারই লোটাস (পদ্ম মহাবিহার) বিহার। ২০১৪ সালে বিহারের উত্তর বাহু খননে বেরিয়েছে পোড়া মাটির টেরাকোটা, যা বিহারের দেওয়ালে সারিবদ্ধভাবে লাগানো রয়েছে।

তারা জানান, বিহারে এ পর্যন্ত খননে বেরিয়ে এসেছে ৩৩টি মূল্যবান প্রত্নসম্পদ। প্রতিটি কক্ষেই বৌদ্ধ মূর্তি রাখার জন্য পৃথক ব্যবস্থা ছিল। পাওয়া গেছে বিহারের পূর্বমুখী প্রধান প্রবেশদ্বার এবং আট মিটার দৈর্ঘ এবং আট মিটার প্রস্থের হলঘর। যেখানে অতিথিরা এসে অপেক্ষা করতো বিহারে প্রবেশের অনুমতির জন্য। এ হল ঘরে পাওয়া গেছে চারটি গ্রানাইট পাথরের পিলার যা ইতিপূর্বে বাংলাদেশের কোনো বৌদ্ধ বিহারে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে পাওয়া যায়নি। পাওয়া গেছে বিহারের ছাদের ভগ্নাংশ যার পুরুত্ব ৬০ সেন্টিমিটার। বিহারটির আশপাশে এখনও পড়ে রয়েছে অসংখ্য পাথরের সাদাকালো বিম ও পিলার।

আরও পড়ুন: নওগাঁয় পুকুর থেকে আবারও প্রাচীন মূর্তি উদ্ধার

প্রত্নতাত্ত্বিকদের ধারণা, ব্যাপক অনুসন্ধান, উৎখনন ও গবেষণার মাধ্যমে পাল সম্রাট রামপালের রাজধানী রামাবতীর সন্ধান মিলে যেতে পারে এ জগদ্দল বৌদ্ধ বিহারে। 

তাদের ধারণা, সেই রামাবতী নগর এখানেই ছিল। কেননা কাছেই রয়েছে চকআমাইর নামে একটি জনপদ। ভৌগলিক অবস্থান, ভবন-অট্টালিকার ধ্বংসাবশেষ ও নামের সঙ্গে কিছুটা মিল থাকায় আড়ানগর ও লক্ষণ পাড়ার কাছে চকআমাইর গ্রামটিই ‘রামাবতী’ বলে অনুমিত হয়।


একাত্তর/এসি