ই-মুভি প্ল্যানের ফাঁদে ফেলে ৪০০ কোটি টাকা লোপাট!

ই-মুভি প্ল্যান নামের একটি অ্যাপের মাধ্যমে দেশের ১৬টি জেলার প্রায় ৪০ হাজার মানুষের কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে দেশি-বিদেশি একটি চক্র।

একাত্তর টেলিভিশনের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, দেশি-বিদেশি এই চক্র গেলো এক বছরে কমপক্ষে ৪০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে উধাও হয়ে গেছে।

এই পুরো টাকাই বিদেশে পাচার হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সেই সঙ্গে সর্বস্ব খুইয়েছেন প্রত্যন্ত অঞ্চলের হাজার হাজার মানুষ। লোভ করতে গিয়ে ফকির হয়েছেন অনেকে।

কেস স্টাডি- এক। চা বিক্রেতা তাইফুর রহমান। ৩০ বছর ধরে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের পাশে এই দোকানেই চা বিক্রি করছেন। স্বল্প আয় হলেও চলছিলো স্বাভাবিক জীবন।

গেলো ডিসেম্বরে দোকানের এক কাস্টমারের মাধ্যমে ই-মুভি প্লান নামের একটি অ্যাপ সম্পর্কে ধারণা পান তাইফুর। সেখানে টাকা দিলেই নাকি- লাভ আসে কয়েকগুণ। তাও আবার ডলারে।

প্রথমে কিছুটা লাভ পাওয়ায়, আরো বেশি লাভের আশায় তিনি ঋণ করে এক লাখ টাকা লগ্নি করেন। এরপর থেকে আর সেই অ্যাপের আর কোন হদিস নেই।

শুধু তাইফুর না। এই এলাকার শতাধিক তরুণ ই-মুভি অ্যাপে টাকা লগ্নি করে বিপাকে পড়েছেন। এই যেমন আসবাবপত্র ব্যবসায়ী জুয়েল রানা টিটু। তিনি একাই খুইয়েছেন প্রায় ৫০ লাখ টাকা।

রাজশাহীর কোথায় কোথায় এই অ্যাপের কার্যক্রম চলছে তা জানতে অনুসন্ধানে নামে একাত্তর টেলিভিশনের বিশেষ দল। খুঁজে পাওয়া যায় একটি তালিকা।

সেখানে ঢাকা, রাজশাহী, চাপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, ঢাকাসহ দেশে ১৬ জেলার ৩২ জন প্রতিনিধির নাম ও ঠিকানা বেরিয়ে আসে। এই তালিকা ধরে রাজশাহী মহানগরীর কয়েরদাড়া এলাকায় পাওয়া যায় ই-মুভির রাজশাহী সিটি পার্টনার পরিচয় দেয়া রাশিদুল ইসলামকে।

একটি বে-সরকারি জুট মিলে কর্মরত রাশিদুল বলছেন, একই প্রতিষ্ঠানে কাজের সুবাদে তার পরিচয় হয় আজমুল হুদা মানিকের সাথে। মানিকের হাত ধরেই জড়িয়ে পড়েন ই-মুভির সাথে।

রাশিদুলসহ বিভিন্ন জনের সাথে কথা বলে যে তথ্য পাওয়া যায় তাতে শহর ও গ্রামের বিভিন্ন এলাকায় সংক্রামক ব্যাধির মত ছড়িয়েছে ই-মুভি অ্যাপ ব্যবহারকারীর সংখ্যা।

সিটি কর্পোরেশনের ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের নারিকেলবাড়িয়া এলাকার অবস্থা আরো ভয়াবহ। শিশু থেকে বৃদ্ধ সবাই এই অ্যাপে আশক্ত।

এই ভুক্তভোগীরা জানান তাদের এই অ্যাপে কাজ করতে আগ্রহ তৈরি করেছেন স্থানীয় মুদি দোকানি শফিকুল ইমলাম। যার অধীনেই রয়েছে ৩৬৮ জন।

শফিকুল জানায়, মানিকের সাথে যোগাযোগ করার পর থেকেই ই-মুভি পরিচয়ে রায়হান নামের এক ব্যক্তি বিদেশ থেকে হোয়ার্টঅ্যাপে কল দিয়ে তাকে সিটি পার্টনার হতে যোগাযোগ শুরু করে।

গোদাগাড়ী উপজেলার প্রেমতলী ইউনিয়নে গিয়েও পাওয়া যায় অসংখ্য ভুক্তভোগী। এখানকার অনেক ব্যবসায়ী আছেন যারা মোটা অংকের টাকা খুইয়ে এখন লোক-লজ্জার ভয়ে মুখ খুলতে চাইছেন না। এখানে জানা যায় শিহাব, তৌফিক ও ওমর ফারুকের নাম।

অ্যাপ বন্ধের পর থেকে গাঢাকা দিয়েছে শিহাব, তৌফিক ও ফারুক। তবে পাওয়া যায় মিঠুকে। এদিকে শিহাব, ওমর ফারুকদের ফেসবুকে দেখা যায়, মানিকের সাথে সখ্যতা ছিলো তাদের।

অনুসন্ধানে পাওয়া যায়, প্রতি এলাকায় যার হাত ধরে অ্যাপটি এসেছে তাদের সবাই যোগাযোগ রাখতো আজমুল হুদা মানিক নামের এক ব্যক্তির সাথে।

মানিকের খোঁজ করতে গিয়ে জানা যায়, মানিক ই-মুভির একজন সিটি পার্টনার। রাজশাহীর শিরোইল কলোনীর সাড়ে ৩ নম্বর গলির এই বাসাতে পরিবার নিয়ে ভাড়া থাকেন তিনি।

এখানেই একটি রুমে রীতিমত অফিস খুলে পরিচালনা করনে ই-মুভির কার্যক্রম। তবে এখন সেই অফিস বন্ধ, মানিক লাপাত্তা।

মানিকের গ্রামের বাড়ি নওগাঁ জেলা মান্দা উপজেলার পাকুড়িয়া গ্রামে। সেখানে গেলে মানিকের বাবা জানালেন, বেশ কয়েক মাস ধরে বাড়ি আসে না মানিক।

নওগাঁ জেলার ৩টি উপজেলার অন্তত ১৫টি গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ খুইয়েছেন কোটি কোটি টাকা। এই জেলার দায়িত্বে ছিলেন ফরহান আহমেদ ও তৌফিক আহমেদ।


ফারহান বলছেন, তাকে ই-মুভিতে একাউন্ট খুলতে বলে মানিক। এই দুই জনের মাধ্যমেই কয়েক হাজার মানুষ এর সাথে জড়িয়ে পড়েন।

রাজশাহী, নওগাঁ, নাটোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, সিরাজগঞ্জের অন্তত ২ হাজার ভুক্তভোগীর সাথে কথা হয়। তবে তারা কেউই জানে না এই অ্যাপের মূল মালিক কে।

অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে গত ৭ জানুয়ারি ঢাকার একটি পাঁচ তারকা হোটেলে সিটি পার্টনার ও বড় বিনিয়োগকারীদের নিয়ে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়।

সেখানে দেশের বিদেশ থেকে তিন পুরুষ ও একজন নারী অংশ নেন। যারা নিজেদের ই-মুভির ভাইস প্রেসিডেন্ড, এশিয়ান কাউন্ট্রি ডিরেক্টর ও গণসংযোগ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দেয়।

এদের মধ্যে একজন মাইকেল, যিনি বিভিন্ন সময় ফেসবুক লাইভে এসে ই-মুভির বিভিন্ন অফার সম্পর্কে গ্রাহকদের ধারনা দিতেন।

হোটেলটির কর্তৃপক্ষ জানায়, কোন প্রতিষ্ঠান নয় একজন ব্যক্তি নগদ টাকায় সাততলার সম্মেলন কক্ষটি ভাড়া নেয়। তবে তার নাম জানাতে অপারগতা প্রকাশ করে কর্তৃপক্ষ।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ইমুভিপ্ল্যান অ্যাপের মাধ্যমে কোটি টাকার উপরও খুইয়েছেন অনেকে। আর লাখ টাকা হারানোর সংখ্যা হাজার হাজার।

আর প্রতিষ্ঠানটির ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে ব্রায়ান জন ও মাইকেল নামে দুজনের নাম জানা গেছে। এছাড়াও ‘অল ইভেন্টস ডট ইন’ নামের একটি পেইজ থেকে চলতো এটির প্রচারণা।

আরও পড়ুন: সমস্যা ছাড়াই শেষ হলো মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষা

যা নাটোরের আব্দুল্লাহপুর থেকে পরিচালনা করেন সাদেক আলী নামের একজন। আব্দুলপুর জংশন স্টেশনে নেমে কিছুক্ষণ খোজের পাওয়া যায় সাদেক আলীকে।

তিনি স্বীকার করেন, তার মাধ্যমেই আব্দুলপুরসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামের প্রায় তিনশ’ মানুষ ই-মুভি অ্যাপ ব্যবহার করে।

মোসাব্বিরের খোঁজে ঢাকার বিভিন্ন সিটি পার্টনারদের কার্যালয়ের ঠিকানায় গিয়ে ই-মুভির কোন অফিস পাওয়া যায়নি।

অনুসন্ধান বলছে, দেশের ১৬ জেলার কমপক্ষে ৪০ হাজার মানুষ ৪০০ কোটি টাকা এই অ্যাপের মাধ্যমে খুইয়েছেন এবং তা দেশের বাইরে চলে গেছে বলে ধারনা করা হচ্ছে।

জালিয়াতি চক্রের মূলহোতারা বাংলাদেশি নন, তাদের খুঁজে বের করতে দরকার আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর সক্রিয় অভিযান বলেই মনে করছেন আইটি বিশেষজ্ঞরা।


একাত্তর/আরএ