বাগেরহাটে হযরত খানজাহান আলীর মাজারের প্রায় ৬০০ বছর পুরনো দিঘীতে ভারতীয় কুমির আবারও ডিম দিয়েছে।
ঐতিহ্যবাহী ওই দিঘীর পাড়ে একটি মা কুমির মাটি খুড়ে ডিম পেড়ে বাচ্চা ফুটানোর জন্য ‘তা’ দিচ্ছে। গত বেশ কয়েক বছর ধরে ওই কুমিরটি ডিম পাড়লেও ছানা ফুটছে না।
২০১৫ সালে ইনকিউবেটরে রেখে চেষ্টা করেও কুমিরের ডিম থেকে ছানা ফোটানো যায়নি।
দিঘীতে খানজাহানের পালিত কুমিরের শেষ বংশধর প্রায় শতবছর বয়সী ‘ধলাপাহাড়’ ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মারা গেছে। মাজারে এসে ‘কালাপাহাড় ও ধলাপাহাড়ের’ বংশধর কোন কুমির দেখতে না পেয়ে দর্শনার্থীরা মনে কষ্ট নিয়ে ফিরে যাচ্ছেন। এবার ওই ডিম ফুটে কুমিরের ছানা হবে এমন আশায় বুক বেঁধেছেন মাজারের খাদেমরা।
দিঘীর পূর্ব পাড়ে বৃহস্পতিবার সরজমিনে গিয়ে দেখা মেলে একটি কুমিরের। দিঘীর পানি থেকে প্রায় ২০ গজ দুরে একটি কুমির চার পা দিয়ে মাটি আঁকড়ে রেখেছে। ওই মাটিতে গর্ত খুড়ে ডিম পেড়ে মা কুমিরটি ‘তা’ দিচ্ছে। মানুষ আর নড়াচড়ার শব্দ পেলেই ডিম রক্ষা করতে কুমিরটি তেড়ে আসছে। ওই গর্তের উপরে ঝোপ জঙ্গলে ভরা। কুমিরটি যাতে নির্বিঘ্নে ডিম ‘তা’ দিতে পারে সেজন্য জায়গাটি ঘিরে রাখা হয়েছে। মাজারে আসা দর্শনার্থীরা খবর পেয়ে কুমির দেখতে বিনা ফকিরের বাড়িতে ভিড় জমাচ্ছেন।
মাজারের খাদেম বিনা ফকির জানান, প্রায় এক মাস আগে দিঘী থেকে ওই কুমিরটি তার বাড়িতে মাটি খুঁড়ে বেশ কয়েকটি ডিম পেড়েছে। এখন মা কুমিরটি বাচ্চা ফোটানোর জন্য তা দিচ্ছে। মাঝে মধ্যে অল্প সময়ের জন্য কুমিরটি দিঘীতে নামলেও আবার ফিরে আসে ডিমের কাছে। এর আগেও তাদের বাড়িতে কুমির মাটি খুঁড়ে ডিম পেড়েছে। কিন্তু ওই ডিম থেকে ছানা ফোটেনি। কুমিরটি দেখতে প্রতিদিন অসংখ্য দর্শনার্থী তাদের বাড়ি আসায় তারাও খুশি।
মাজারের প্রধান খাদেম শের আলী ফকির জানান, হযরত পীর খানজাহান আলী দিঘী খনন করে ‘কালাপাহাড় ও ধলাপাহাড়’ নামে দুইটি কুমির লালনপালন করেন। ওই জুটির প্রায় শতবছর বয়সী বংশধর কয়েক বছর আগে দিঘিতে মারা গেছে। এখন ‘কালাপাহাড় ও ধলাপাহাড়ের’ কোন বংশধর কোথাও আছে কি না, তিনি জানেন না।
খাদেম শের আলী ফকির আরও জানান, মাজারের দিঘিতে এখন যে কুমির আছে, সেটি প্রতিবছর ডিম দিলেও বাচ্চা হচ্ছে না। এবারও কুমির ডিম দিয়েছে। ওই ডিম যাতে ফোটানো যায় এজন্য তিনি সরকারের কাছে তিনি দাবি জানান।
মাজার পরিচালনা কমিটির সদস্য ফকির মহিতুল ইসলাম সুমন জানান, আগেই দিঘীতে পুরাতন কুমিরের সংকট ছিল। এ অবস্থায় ভারতের মাদ্রাজ থেকে উপহার হিসাবে পাওয়া কয়েকটি কুমির দিঘীতে অবমুক্ত করা হয়। এখন এই দিঘীতে ভারতীয় একটি পুরুষ এবং একটি মাদি কুমির রয়েছে। গত কয়েক বছর ধরে ওই মাদি কুমিরটি প্রতি বছর মার্চের শেষ বা এপ্রিল মাসের প্রথম দিকে দিঘীর পাড়ে এসে ডিম পাড়ছে। কিন্তু ওই ডিম থেকে একটি ছানাও ফোটেনি। এমনকি ইনকিউবেটরে রেখে চেষ্টা করেও কুমিরের ডিম থেকে ছানা ফোটানো যায়নি। দিঘীর ঐতিহ্য ধরে রাখতে নতুন করে মাদি এবং পুরুষ প্রজাতির কুমির আনার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানান তিনি।
এসময় মাজার ও দিঘীর পাড়ে দেখা মেলে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা অসংখ্য নারী-পুরুষ দর্শনার্থীদের। দর্শনার্থীদের অনেকেই একাত্তর প্রতিবেদকের কাছে তাদের মনের কষ্ট এবং দাবির কথা জানালেন।
চট্টগ্রাম থেকে আশা দর্শনার্থী আবু হুড়াইয়া বলেন, মাজারে দিঘির কুমির দর্শনার্থীদের প্রধান আকর্ষণ। সেই দিঘীতে খানজাহানের লালনপালন করা ‘কালাপাহাড় ও ধলাপাহাড়ের শেষ বংশধরও বেঁচে নেই। কালাপাহাড় ও ধলাপাহাড়ের বংশধর এই দিঘিতে সংরক্ষণ করা উচিত ছিল।
খুলনা থেকে আসা মনিরা বেগম জানান, ছোট বেলায় তার মায়ের কোলে চড়ে মাজারে আসতেন তিনি। তখন দিঘীর পাড়ে কালাপাহাড় ও ধলাপাহাড়ের বংশধর তিনি নিজে দেখেছেন, এমনকি মানত হিসেবে কুমিরের সামনে হাঁস-মুরগীও দিয়েছেন। এখন সেই দিঘিতে খানজাহানের লালনপালন করা কুমিরশুন্য। ওই কুমিরের কোনো বংশধর দেখতে না পেয়ে মনে কষ্ট নিয়ে থাকে ফিরে যেতে হচ্ছে।
সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আজাদ কবির জানান, দিঘীর ওই কুমির নানা কারণে প্রজনন ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। একারণে প্রতিবছর ডিম দিলেও ওই ডিম থেকে ছানা ফুটছে না। এ অবস্থায় নতুন করে অল্পবয়সী দুটি নারী-পুরুষ প্রজাতির কুমির দিঘীতে অবমুক্ত করার পরামর্শ দেন তিনি।
বাগেরহাট জেলা প্রাণীসম্পদ কর্মকর্তা ডা. শফিকুল ইসলাম জানান, কুমিরের ডিম দেওয়ার তথ্য মাজারের পক্ষ থেকে তাকে জানানো হয়নি। ডিম থেকে ছানা না ফোটার নানা কারণ থাকতে পারে। বিভিন্ন কারণে কুমির প্রজনন ক্ষমতা হারাতে পারে। এজন্য হয়তো কুমির বারবার ডিম দিলেও ছানা ফুটছে না।
বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক ও মাজার পরিচালনা কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ আজিজুর রহমান জানান, ওই কুমিরের ডিম থেকে ছানা না ফোটার বিষয়টি নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সাথে আলোচনা করা হবে। দিঘীতে কুমির সংরক্ষণ এবং তার বংশ বৃদ্ধির জন্য উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান জেলা প্রশাসক।
আরও পড়ুন: মুজিবনগরে বজ্রপাতে মাঠে থাকা কৃষকের মৃত্যু
হযরত খানজাহান আলী সুলতানি শাসন আমলে খ্রিষ্টীয় ১৪ শতকের প্রথম দিকে বাগেরহাট অঞ্চলে আসেন। বাগেরহাটে খলিফাতাবাদ নগর প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। তিনি অসংখ্য জলাশয় খনন করে এ অঞ্চলের জলকষ্ট দূর করেছেন। একসময় ঠাকুর দিঘী নামে পরিচিত ৩৬০ বিঘা জমির ওপর বিশাল এ দিঘী খনন করেন, যা খাঞ্জেলী দিঘী নামেও পরিচিত। ওই দিঘীর দৈর্ঘ্য ও প্রস্ত প্রায় সমান। ওই দিঘীতে তিনি ‘কালাপাহাড় ও ধলাপাহাড়’ নামে দুইটি কুমির লালনপালন করতেন। দিঘীর উত্তর পাড়ে রয়েছে খানজাহানের মাজার। খানজাহানের দিঘীর কুমিরগুলোও এ অঞ্চলের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অংশ হয়ে রয়েছে।
একাত্তর/জো