সাত সন্তানের কারো ঘরেই ঠাঁই হলো না মা-বাবার

শিক্ষক-ব্যবসায়ীসহ সাত সন্তানের ওপর ভরসা নেই বৃদ্ধ মা-বাবার। সন্তানদের ঘরে ঠাঁয় না পাওয়া দম্পতির এখন একমাত্র ভরসা শিবগঞ্জের ইউএনও ও এক বাল্য বন্ধু।

পাঁচ সন্তানকে নিয়ে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে দুই দিনের পারিবারিক সংলাপের পর এমনই মন্তব্য আসে বৃদ্ধ দাহারুল ইসলামের মুখ থেকে। তবে ইউএনও এর হস্তক্ষেপে শেষ পর্যন্ত মেজ মেয়ের বাড়িতে থাকতে রাজি হয়েছেন সেই হতভাগ্য দম্পতি।

ঘটনাটি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার কাজিপাড়া গ্রামের।

শুক্রবার মধ্যরাতে দ্বিতীয় সংলাপ শেষে বাবা মায়ের এমন আবেদনের প্রেক্ষিতে শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বার্হী অফিসার উপস্থিত দুই ছেলেকে পিতার হাতিয়ে নেয়া ২৩ লাখ টাকা ফেরতের মাধ্যমে ঐ টাকার লভ্যাংশ থেকেই আলাদা ভাড়া বাড়িতে রাখার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। আর ২০মে পর্যন্ত মেজ মেয়ের বাড়িতে যেতে রাজি হন ঐ দম্পতি।   

হতভাগ্য পিতা-মাতারা হলেন-চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার শ্যামপুর ইউনিয়নের কামাটোলা বাবুপুর গ্রামের দাহারুল ইসলাম (৯০) ও তার স্ত্রী শেরিনা বেগম (৮৫)।

স্থানীয়রা জানায়, সন্তানরা দেকভাল না করায় পাঁচ মাস আগে কানসাট ইউনিয়নের কাজিপাড়া এলাকায় একটি ভাড়া বাড়িতে ওঠেন বৃদ্ধ দাহারুল ও তার স্ত্রী। 

প্রবাসী বাড়ির মালিক শামিম বাড়ি ছাড়ার নোটিশ দিলে উপায়ন্ত না দেখে বাল্য বন্ধু আমিনুলের বাড়িতে আশ্রয় নেন ৩ মে। বিষয়টি জানাজানি হলে ও এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর ব্যপক সমালোচনার ঝড় ওঠে সামাজিক মাধ্যমে। বিষয়টি জেনে শিবগঞ্জ ইউএনও বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার আমিনুল ইসলামের বাড়িতে বৃদ্ধের সকল সন্তানকে তলব করেন এবং পারিবারিক সংলাপে বসেন। সংলাপে দুই ছেলে হাজির না হলেও তিন মেয়ে ও দুই ছেলের উপস্থিতিতে পিতার হাতিয়ে নেয়া ২৩ লাখ টাকা ২০ মে এর মধ্যে ফেরতের এবং সেই টাকার সঞ্চয়পত্রের লাভের টাকায় বৃদ্ধ মা-বাবার খরচ বহনের সিদ্ধান্ত হয়।

অন্যদিকে ছেলেদের প্রতি অবিশ্বাসের কারণে বন্ধুর বাড়িতে থাকার সিদ্ধান্ত জানায় বৃদ্ধ দাহারুল। শেষে ২০ মে পর্যন্ত মেয়ের বাড়িতে এবং পরবর্তীতে পিতামাতার সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে তাদের অন্য কোন স্থানে থাকার ব্যবস্থা করে দেয়ার সিদ্ধান্ত জানান ইউএনও।

আমিনুল ইসলাম ক্ষোভের সাথে জানান, তার বন্ধুর বড় ছেলে রায়নুল হক ঢাকায় ব্রাকে চাকরি করে। মেজো ছেলে বাগির আলম ভারতের বাসিন্দা। সেজো ছেলে ইমরান আলি শাহবাজপুর সোনামসজিদ ডিগ্রী কলেজের শিক্ষক। তার শিবগঞ্জ বাজারে একটি তিনতলা আলিসান বাড়ি ও একাধিক স্ত্রী রয়েছে। ছোট ছেলে সাইদুর রহমান শিবগঞ্জের বড় ব্যবসায়ী। সম্প্রতি সে এক কোটি ২০ লাখ টাকায় একটি বাড়ি শিবগঞ্জ শহরে কিনেছেন। সন্তানরা সবাই কোটিপতি হয়েও বৃদ্ধ মা-বাবাকে দেখভাল না করাটা দু:খজনক।

বৃদ্ধ দাহারুল ক্ষোভের সাথে জানান, তার সন্তানরা কেউ খোঁজ না রাখায় ও ছেলেদের প্রতি বিশ্বাস না থাকায় আমার বন্ধু ও ইউএনও সাহেবই আমার ভরসা।

আমরা কারো দয়ায় নয়, নিজেদের সম্পদ দিয়ে মর্যাদার সাথেই বাকি জীবনটা কাটাতে চাই।


কান্নাজড়িত কণ্ঠে মা শেরিনা বেগম  বলেন, তার সব ছেলেই এখন কোটিপতি। মেয়েদের মধ্যে মেজ মেয়ে পারচৌকা উচ্চ বিদ্যালয়ের  শিক্ষক। আর এক মেয়ের স্বামী তারাপুরের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। অপর মেয়ের স্বামী মারা যাওয়ায় ঐ মেয়েটি নিজেই অসহায়। তারপরও আমাদের দুই জনের ১৩ বিঘা জমি ও ৪০ লাখ টাকা ছিল, যা ছেলে-মেয়েরা হাতিয়ে নিয়েছে। জমি ও টাকা হাতিয়ে  নেয়ার পর কেউ আশ্রয় না দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে। এমনকি আমাদের জাতীয় পরিচয় পত্র দু'টিও তাদের কাছে আছে।

এ ব্যাপারে শাহবাজপুর সোনামসজিদ ডিগ্রী কলেজের সহকারী অধ্যাপক মো: ইমরান আলী পিতামাতার এমন অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেন, তার পিতা মাতার সব সম্পত্তি সব ছেলেমেয়েদের ভাগ করে দিয়েছেন। সর্বশেষ চার বছর আগে বাগান বিক্রির ৮৫ লাখ টাকা ভাগের মাধ্যমে ১০ লাখ টাকা তিনি পেয়েছেন। চার বছর ধরে তিনি তার পিতামাতাকে দেখভাল করলেও অন্য ভাইরোনরা কেউ তাদের খোঁজ নেয়না। সম্প্রতি পারিবারিক ঝামেলার কারণে তিনি তার ভাই বোনদের কিছু দিনের জন্য দায়িত্ব নেয়ার অনুরোধ জানিয়েও সাড়া না পেয়ে সবাইকে তার বাড়িতে আসতে নিষেধ করায় পিতা-মাতা ক্ষুব্ধ হয়ে তার বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছেন।

আরও পড়ুন: ব্রিটেনের রাজ-রানী হিসেবে অভিষিক্ত হলেন চার্লস ও ক্যামেলিয়া

ঢাকায় বসবাসকারী বড় ছেলে রায়নুল সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে বলেন, আমাকে কেন ফোন করেছেন। দেশে থাকা আমার দুই ভাইকে এ নিয়ে বলেন।

এ ব্যাপারে শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার আবুল হায়াত ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, ছেলেদের প্রতি আস্থা না থাকায় আপাতত অসহায় বাবা-মাকে মেয়ের বাড়িতে রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ২৩ লাখ টাকা পাবার পর তাদের কথামত পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

 

একাত্তর/আরবিএস