‘যেখানে দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দেখো তাই, পাইলেও পাইতে পারো মানিক-রতন।’ -এই প্রবাদকে বাস্তবে রূপ দেন মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার কয়েক গ্রামের মানুষ। দেশের বড় বড় স্বর্ণের দোকান থেকে তারা ছাই কিনে আনেন, এরপর সেই ছাই থেকে বের করেন স্বর্ণ। আর এই স্বর্ণকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে একটি জুয়েলারি মার্কেট।
সরেজমিনে মানিকগঞ্জের সিংগাইরে গোবিন্দল গ্রামের রফিকুল ইসলামের বাড়িতে দেখা যায় -জনাবিশেক নারীর কেউ চালুনিতে ছাই চালছেন, কেউ ঢেঁকিতে আবর্জনা ছেঁটে পানিতে মিশিয়ে তৈরি করছেন পিণ্ড। কেউ জাল দিচ্ছেন সিসা।
সিংগাইরের গোবিন্দল ও চারিগ্রাম ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামে দেখা মেলে এমন দৃশ্য। এই কর্মযজ্ঞের উদ্দেশ্য ছাই থেকে স্বর্ণ বের করা। দেড়শ’ বছর ধরে কয়েকটি গ্রামের ৯০ ভাগ মানুষের পেশা এভাবে ছাই থেকে স্বর্ণ উৎপাদন।
এই পেশার সঙ্গে জড়িত এমন ব্যক্তিরা জানান, এই পেশা তাদের গ্রামে চলছে প্রায় সত্তর বছর ধরে। তারা বিভিন্ন জেলা থেকে ছাই কিনে আনেন।
স্বর্ণ উৎপাদনের জন্য সারাদেশ চষে বেড়ান এই পেশাজীবীরা। স্বর্ণের অলংকার তৈরির কারখানা থেকে কিনে আনেন ছাই আর ঝাড়ু দিয়ে ফেলে দেয়া ময়লা-আবর্জনা। এরপর শুরু হয় সেই ছাই আর আবর্জনা থেকে স্বর্ণ-রূপা, তামা-সিসা বের করার কাজ।
ছাই থেকে কিভাবে স্বর্ণ তৈরি হয় তা জানাতে গিয়ে তারা বলেন, যেসব ছাই আমরা কিনে আনি, তার মধ্যে তামা, দস্তা, সোনাসহ আরও কয়েকটি ধাতব পদার্থ পাওয়া যায়।
তারা জানান, কয়েকধাপে সম্পন্ন হয় পুরো প্রক্রিয়া।
এভাবে পাওয়া স্বর্ণ বেচাকেনার জন্য চারিগ্রামেই গড়ে উঠেছে জুয়েলারি মার্কেট। প্রায় ৫০টি দোকানে সেই স্বর্ণ থেকে আবারো তৈরি হয় অলংকার। এই স্বর্ণের মান আমদানি করা স্বর্ণের চেয়ে কোন অংশেই কম নয় বলে জানান জুয়েলারি দোকানের মালিকরা।
জুয়েলারি মার্কেটের দোকান মালিকরা জানান, ছাই থেকে বের করা স্বর্ণ আর আমদানি করা স্বর্ণ একই। এগুলোর মানে তেমন কোন পার্থক্য থাকে না।
মাসে দুইবার এসব স্বর্ণ দোকানে বিক্রি করেন এই পেশাজীবীরা। ছাই থেকে এক ভরি স্বর্ণ বের করতে খরচ পড়ে ২০ হাজার টাকারও কিছু বেশি। এভাবে স্বর্ণ বিক্রি করে মাসে লাভ থাকে ৫০ হাজার টাকা।
তবে ছাই থেকে স্বর্ণ উৎপাদনের ব্যবসায় ঝামেলাও পড়েন এই পেশাজীবীরা। অলংকারের কারখানা থেকে ছাই আর আবর্জনা আনার পথে পুলিশি হয়রানির শিকার হতে হয়। এছাড়া এই ব্যবসার আরেক উপকরণ নাইট্রিক এসিড সংগ্রহেও পোহাতে হয় দুর্ভোগ।
পেশাজীবীরা জানান, তাদের বিভিন্ন জেলা থেকে মাল আনতে নানান ধরনের ভোগান্তি পোহাতে হয়। তাছাড়া তাদের ব্যবসায়ের অতি প্রয়োজনীয় এসিডও সহজে মেলে না।
আরও পড়ুন: ঈদের বাজার ধরতে তৎপর গরু চোররা
তবে এসব দুর্ভোগ সহ্য করেই পূর্বপুরুষের এই পেশা চালু রেখেছেন চারিগ্রাম-গোবিন্দল ইউনিয়নের মানুষ। তাদের উৎপাদিত স্বর্ণে ঝলমল করে জুয়েলারি মার্কেট। বাইরের জেলা থেকেও এখানে স্বর্ণ কিনতে আসেন ব্যবসায়ীরা।
একাত্তর/আরএ