পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার অদম্য স্বপ্ন শৈশব থেকেই পুষে রেখেছিলেন মশিউর। কিন্তু সেই স্বপ্নে হঠাৎ করেই কালবৈশাখীর মতো আঘাত হানে প্রাণঘাতী ব্যাধি ক্যান্সার। কিন্তু হাসপাতালের বিছানা, একের পর এক কেমোথেরাপির যন্ত্রণাদায়ক পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া কিংবা ক্রাচে ভর দিয়ে চলার দিনগুলোও তাঁর মনের জোরকে একচুল টলাতে পারেনি।
অদম্য এই তরুণ জাহাঙ্গীরনগর, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের শীর্ষ চার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়ে তাঁর অদম্য সংকল্পের প্রমাণ দিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত নিজের পছন্দের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগকেই নিজের নতুন ঠিকানা হিসেবে বেছে নিয়েছেন মশিউর।
সপ্তম শ্রেণিতে শুরু মরণঘাতী ব্যাধির সঙ্গে যুদ্ধ: পটুয়াখালীর গলাচিপার বাসিন্দা মশিউরের শরীরে ২০১৯ সালের শেষের দিকে জটিল শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়। পরবর্তীতে ২০২০ সালের শুরুতে চিকিৎসকদের নির্দেশে ভারতে নিয়ে যাওয়া হলে অ্যাপোলো হাসপাতালে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তাঁর ফুসফুসে এক ধরনের ক্যান্সার শনাক্ত হয়।
শুরু হয় জীবনের সবচেয়ে কঠিন লড়াই। ভারত থেকে নয় মাস চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরলেও তাঁর মূল চিকিৎসা চলছিলো ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ ডা. মো. তাওফিকের তত্ত্বাবধানে ঢাকার বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে। সেখানে তাঁকে টানা ৩০টি কেমোথেরাপি নিতে হয়।
শারীরিক যন্ত্রণার মাঝেও পড়াশোনা ও সামাজিক কটূক্তি: কেমোথেরাপির প্রচণ্ড ধকলের কারণে বিজ্ঞানের জটিল পড়া সামলানো কঠিন হয়ে পড়লে তিনি নবম শ্রেণিতে মানবিক বিভাগ বেছে নেন। এই সময় চারপাশের মানুষের নানামুখী হতাশাজনক কথা ও নেতিবাচক মন্তব্য শুনতে হলেও সেগুলোকে পাত্তা দেননি তিনি। এসএসসি পরীক্ষার ঠিক দুই দিন আগে (২৮ মে) ছিল তাঁর কেমোথেরাপির নির্ধারিত তারিখ।
পরিবার পরীক্ষা দিতে মানা করলেও মশিউর দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন। পরবর্তীতে চিকিৎসার জন্য পুনরায় চেন্নাই গেলে কেমোথেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় তাঁর হাঁটুর হাড় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রায় দুই বছর ক্রাচে ভর দিয়ে চলার পর ২০২৩ সালে তাঁর হাঁটুতে সফল অস্ত্রোপচার করা হয়। সেই হাসপাতালের বিছানায় শুয়েই তিনি জানতে পারেন এসএসসিতে তাঁর জিপিএ-৪.৩৯ পাওয়ার খবর।
এইচএসসিতে জিপিএ-৫ ও চার বিশ্ববিদ্যালয়ে সাফল্য: অস্ত্রোপচারের পর বরিশালের অমৃত লাল দে মহাবিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে নতুন উদ্যমে পড়াশোনা শুরু করেন মশিউর। শারীরিক প্রতিকূলতাকে অজুহাত না বানিয়ে তিনি ২০২৫ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় অর্জন করেন কাঙ্ক্ষিত জিপিএ-৫। কলেজের শিক্ষকরা তাঁর এই ধারাবাহিক নিষ্ঠায় মুগ্ধ ছিলেন।
উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে তিনি একের পর এক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে মেধা তালিকায় স্থান করে নেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগে ভর্তি হলেও পরবর্তীতে নিজের স্বপ্নের ক্যাম্পাস জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগকে বেছে নেন।
পরিবারের আত্মত্যাগ ও ভবিষ্যতের স্বপ্ন: মশিউরের এই সাফল্যে আবেগাপ্লুত তাঁর বাবা-মা। দীর্ঘ চিকিৎসার অর্থ জোগানো এবং মানসিকভাবে ছেলেকে আগলে রাখার যে ত্যাগ তাঁরা স্বীকার করেছেন, ছেলের এই সাফল্যে তা সার্থক হয়েছে বলে মনে করেন তারা।
মশিউরের চিকিৎসক ডা. তাওফিকও তার এই মানসিক দৃঢ়তার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে মশিউর জানান, উচ্চশিক্ষা শেষ করে তিনি সামাজিক বা আর্থিক সংকটে থাকা অসুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়াতে চান। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে দেখা স্বপ্ন আজ বাস্তবে রূপ নেওয়ায় তিনি প্রমাণ করেছেন, ইচ্ছাশক্তি ও পরিবারের সমর্থন থাকলে যে কোনো পাহাড়সম বাধাই জয় করা সম্ভব।