বাবা দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ, জীবনসংগ্রামে টিকে থাকতে না পেরে মা-ও পাড়ি জমিয়েছেন নতুন সংসারে। স্বজন হারিয়ে আর তীব্র দারিদ্র্যে পেট চালাতে পথেই নেমে পড়তে হয়েছিলো শিশু রহমাতউল্লাহ ও আব্দুল্লাহকে। বয়সের ভারে ন্যুব্জ দাদার সংসারে দুবেলা ভাত জোটানোই যেখানে অনিশ্চিত, সেখানে স্কুলে যাওয়া ছিলো শুধুই দুঃস্বপ্ন। তবে অবশেষে ঘুচলো সেই অনিশ্চয়তার দিন; দুই ভাইয়ের শৈশব ফেরাতে এবং তাদের হাতে বই তুলে দিতে পরম মমতায় পাশে দাঁড়ালো গলাচিপা উপজেলা প্রশাসন।
পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার চরবিশ্বাস ইউনিয়নের অতি দরিদ্র পরিবারের জন্ম রহমাতউল্লাহ ও আব্দুল্লাহর। তাদের বাবা আলিউল মাতুব্বর দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ। স্বামীকে হারিয়ে অসহায় মা-ও একপর্যায়ে দ্বিতীয় বিয়ে করে নতুন সংসার শুরু করেন। এতে কার্যত অভিভাবকহীন হয়ে পড়ে এই দুই শিশু।
তাদের শেষ আশ্রয় হয় বৃদ্ধ ও শারীরিকভাবে অসুস্থ দাদা মনির মাতুব্বের কাছে। পেশায় দরিদ্র এই কৃষকের নিজের আহার জোটানোই যেখানে অসম্ভব, সেখানে দুই নাতির ভরণপোষণ চালানো হয়ে পড়ে অসাধ্য। বেঁচে থাকার তাগিদে দুই ভাই শেষ পর্যন্ত বেছে নেয় পান ও ঝালমুড়ি বিক্রির কাজ। হাট-বাজার ও খেলার মাঠে ঝালমুড়ির পাত্র হাতে কেটে যাচ্ছিলো তাদের রঙিন শৈশব, অথচ মনের গহীনে আঁকড়ে ধরেছিলো পড়াশোনা করে মানুষ হওয়ার অদম্য স্বপ্ন।
সম্প্রতি দুই ভাইয়ের অনাহারে দিন কাটানো ও উপার্জনে নেমে পড়ার করুণ খবরটি নজরে আসে গলাচিপা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবুজর মো. ইজাজুল হকের। তিনি অবিলম্বে দুই শিশুকে নিজ কার্যালয়ে ডেকে পাঠান এবং তাদের সঙ্গে কথা বলে পড়াশোনার অদম্য ইচ্ছার কথা জানতে পারেন।
এর পরপরই ইউএনও’র নির্দেশে ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার সরাসরি উদ্যোগে দুই ভাইকে চরবিশ্বাস সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয়। একই সঙ্গে প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের স্কুল ড্রেস, বই-খাতাসহ প্রয়োজনীয় শিক্ষাসামগ্রী কিনে দেওয়া হয়।
জীবিকার তাগিদে এতোদিন যে হাতে পানের বরজ বা ঝালমুড়ির পাত্র থাকত, আজ সেই হাতে নতুন পোশাক আর বই-খাতা পেয়ে আনন্দে আত্মহারা দুই ভাই। তাদের চোখে-মুখে এখন শুধুই ঘুরে দাঁড়ানোর আনন্দ ও নতুন করে স্বপ্ন দেখার আলো।
গলাচিপার ইউএনও বলেন, শিশুদুটির করুণ জীবনসংগ্রামের কথা জানতে পেরে তাদের কার্যালয়ে এনে কথা বলি। পরে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তাদের ভর্তি নিশ্চিত করা হয়েছে। তাদের পড়াশোনার স্বপ্ন পূরণ করতে পেরে অত্যন্ত ভালো লাগছে। ভবিষ্যতে তাদের সার্বিক খোঁজখবর রাখবে উপজেলা প্রশাসন।
উপজেলা প্রশাসনের এই মানবিক উদ্যোগে স্থানীয় বাসিন্দা ও বিশিষ্টজনেরা ব্যাপক প্রশংসা প্রকাশ করেছেন।
