মামলার আসামি নন, অথচ নাম-বাবার নাম ও গ্রামের নাম মিলে যাওয়ায় পটুয়াখালীর এক জেলেকে গ্রেপ্তার করে ১৮ দিন কারাগারে রাখার অভিযোগ উঠেছে মহিপুর থানা পুলিশের বিরুদ্ধে। মো. জলিল হাওলাদার নামে ওই জেলেকে একটি গ্রেপ্তারি পরোয়ানার বিপরীতে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে বিষয়টি আদালতের নজরে এলে সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) তাকে জামিন দেওয়া হয়েছে।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন মুক্তি পাওয়া জলিল হাওলাদারের আইনজীবী অ্যাডভোকেট হুমায়ুন কবীর বাদশা।
তিনি বলেন, মামলার প্রকৃত আসামি বর্তমানে প্রবাসে থাকেন। কিন্তু নাম, বাবার নাম ও গ্রামের নাম মিলে যাওয়ায় পুলিশ তার মক্কেলকে গ্রেপ্তার করেছিল। সোমবার আদালতে বিষয়টি উপস্থাপন করা হলে জলিল হাওলাদারকে জামিন দেওয়া হয়। একইসঙ্গে ভুল ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় মহিপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি)কে মামলার পরবর্তী ধার্য তারিখে আদালতে উপস্থিত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ভুক্তভোগী পরিবার ও মহিপুর থানা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৯ আগস্ট দুপুরে কলাপাড়া উপজেলার মহিপুর থানাধীন শিববাড়িয়া এলাকা থেকে মহিপুর থানা পুলিশের সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) শহিদুল ইসলাম মো. জলিল হাওলাদারকে গ্রেপ্তার করেন। পরে একই দিন তাকে কলাপাড়া সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তোলা হলে বিচারক তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এরপর তিনি পটুয়াখালী জেলা কারাগারে ছিলেন।
গ্রেপ্তার হওয়া জলিল হাওলাদারের মেয়ে জেসমিন আক্তার অভিযোগ করে বলেন, তার বাবাকে গ্রেপ্তারের খবর শুনে তিনি তাৎক্ষণিক ঘটনাস্থলে ছুটে যান। এ সময় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও মামলার বিষয়টি যাচাই-বাছাই করার জন্য দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের বলেন। তার বাবার নামে এ ধরনের কোনো মামলা নেই বলেও পুলিশকে জানান। কিন্তু পুলিশ তার ও স্থানীয় লোকজনের আপত্তি উপেক্ষা করে তড়িঘড়ি করে তার বাবাকে কলাপাড়া সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পাঠায়। পরে আদালত তার বাবাকে পটুয়াখালী জেলা কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গ্রেপ্তার হওয়া মো. জলিল হাওলাদারের বাড়ি কলাপাড়া উপজেলার মহিপুর থানার বিপিনপুর শিববাড়িয়া গ্রামে। তিনি ওই এলাকার মো. মালেক হাওলাদার ও মোসা. হালিমা খাতুনের ছেলে। জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী তার বয়স ৪৭ বছর। তিনি পেশায় একজন জেলে।
অন্যদিকে, মামলার প্রকৃত আসামি মো. জলিল হাওলাদারের বাড়িও একই এলাকায়। তিনিও একই এলাকার আবদুল মালেক হাওলাদারের ছেলে। তবে জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী তার মায়ের নাম মাজেদা এবং বয়স ৩৫ বছর। দুই ব্যক্তির পরিচয়ের ক্ষেত্রে শুধু মায়ের নাম ও জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর আলাদা।
প্রকৃত আসামি জলিল হাওলাদারের বড় ভাই হানিফ হাওলাদার বলেন, তার ভাই তিন বছর ধরে প্রবাসে থাকেন। তিনি কোন দেশে আছেন জানতে চাইলে তাদের বাবার সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।
মূল আসামি জলিল হাওলাদারের বাবা আবদুল মালেক হাওলাদার বলেন, তার ছোট ছেলে মো. জলিল হাওলাদার ২০২৩ সালের দিকে সৌদি আরবে চলে যাওয়ার পর আর দেশে ফেরেননি। তবে তার ছেলের পরিবর্তে পুলিশ অন্য একজনকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানোর বিষয়টি তিনি মহিপুর থানা-পুলিশের কাছ থেকে জানতে পেরেছেন বলে জানান।
মামলার নথি ও আদালত সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালের ২৩ মে পটুয়াখালী সদর উপজেলার সেহাকাঠি গ্রামের মো. রফিক মুন্সির ছেলে আলমগীর হোসেন পটুয়াখালী সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে অর্থ প্রতারণার অভিযোগে একটি মামলা করেন। ওই মামলায় তিনি কলাপাড়া উপজেলার মহিপুর থানার শিববাড়িয়া এলাকার আবদুল মালেক হাওলাদারের ছেলে মো. জলিল হাওলাদারকে একমাত্র আসামি করেন। মামলার আরজিতে তিনি আসামির কাছে দুই লাখ ৭৩ হাজার ৫৭৩ টাকা পাওনা থাকার কথা উল্লেখ করেন।
পটুয়াখালী সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ২৩ জানুয়ারি আসামি জলিল হাওলাদারের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। পরে একই বছরের ৮ মে তার সম্পদ জব্দ করার আদেশ দেওয়া হয়। তবে সোমবার একই আদালতের বিচারক মো. আবু বকর নিরপরাধ জলিলের জামিন মঞ্জুর করেন।
মামলার বাদী মো. আলমগীর হোসেন বলেন, মামলা করার বছরই আসামির বিরুদ্ধে আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। এরপর তিনি জানতে পারেন, আসামি দেশের বাইরে চলে গেছেন। কিছুদিন আগে মহিপুর থানার ওসি তাকে ফোন করে আসামি গ্রেপ্তারের বিষয়টি জানান এবং তার কাছ থেকে আসামির জাতীয় পরিচয়পত্র ও ছবি সংগ্রহ করেন। এরপর কী হয়েছে, তা তার জানা নেই।
এদিকে, আসামির নাম, বাবার নাম ও গ্রামের নাম মিলে যাওয়ার কারণে অনিচ্ছাকৃতভাবে ভুল ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি স্বীকার করেছেন মহিপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শামীম হাওলাদার।
তিনি বলেন, গ্রেপ্তারি পরোয়ানার কপিতে আসামির মায়ের নাম এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মোবাইল নম্বর উল্লেখ থাকলে এ ধরনের ভুল হওয়ার সুযোগ ছিল না। তবে ভুল ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের পর তার জামিন পাওয়ার বিষয়ে আইনজীবী নিয়োগসহ সার্বিক সহযোগিতা করা হয়েছে।