ওপেন সিক্রেট ‘ঘুষ’: দরকষাকষি করেই টাকা নেন তহশিলদার সোবাহান

একটি নামজারির জন্য সরকারি ফি এক হাজার ১৭০ টাকা। কিন্তু সেই নামজারির জন্য দাবি করা হয় ৭০ হাজার টাকা। দরকষাকষির পর ২০ হাজার টাকায় ‘রফা’ হয়। অগ্রিম নেওয়া হয় ১০ হাজার টাকা। গুণে গুণে দুই দফায় এই টাকা নেয়া হয়। 

এরপর চারটি দলিলের বদলে দুইটি দলিলের এক নামজারি করেই অগ্রিম নেয়া সেই টাকা রেখে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী ইউনিয়ন ভূমি উপসহকারী কর্মকর্তা (তহশিলদার) আবদুস সোবাহানের বিরুদ্ধে। এ ঘটনার একাধিক ভিডিও প্রমাণ একাত্তরের হাতে এসেছে।

এ ঘটনার ভুক্তভোগী রাঙ্গাবালী উপজেলার চরমোন্তাজ ইউনিয়নের দক্ষিণ চরমোন্তাজ গ্রামের বাসিন্দা মহিউদ্দিন খন্দকারের অভিযোগ, গত ২০ মে ভূমিসেবা মেলার সময় ছয়টি দলিলের নামজারি করাতে সোবাহানের কাছে যান তিনি। কাগজপত্র দেখে দুটি দলিল বাদ দিয়ে চারটি দলিলের ২ একর ৪২ শতাংশ জমির নামজারির জন্য প্রথমে ৭০ হাজার টাকা দাবি করেন সোবাহান। পরে ৬০ হাজার এবং একপর্যায়ে দরকষাকষির পর ২০ হাজার টাকায় সমঝোতা হয়।

মহিউদ্দিনের ভাষ্য, সমঝোতা অনুযায়ী প্রথমে পাঁচ হাজার দেন। বাকি পাঁচ হাজার বিকাশের মাধ্যমে দিতে চাইলেও এতে রাজি না হওয়ায় পরে আরও পাঁচ হাজার দেন তিনি। বাকি ১০ হাজার টাকা নামজারি শেষ হওয়ার পর দেওয়ার কথা ছিল। 

কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও মাসখানেক আগে চারটির মধ্যে দুইটি দলিলের ১ একর ৫৩ শতাংশ জমির একটি নামজারি করা হয়। অগ্রিম দেওয়া ১০ হাজার টাকা এই একটি নামজারির জন্য রেখে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ তার। অথচ একটি নামজারির সরকারি ফি মাত্র এক হাজার ১৭০ টাকা। 

নামজারি করা পর্চা প্রিন্ট করার সময় চুক্তির টাকার বাইরে সরকারি ফি বাবদ আরও এক হাজার ১৭০ টাকা দিতে বলা হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন মহিউদ্দিন। 

বিষয়টি প্রত্যক্ষ করেছেন বলে দাবি করেছেন ইউনিয়ন ভূমি অফিসের সামনে অবস্থিত রাঙ্গাবালী কম্পিউটার এন্ড ফটোস্টার্টের স্বত্বাধিকারী আল আমিন সিকদার। 

তিনি বলেন, নামজারির ফি জমা দিতে গিয়ে দুইজনের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে কথা কাটাকাটিও হয়। পরে তহশিলদার এক হাজার এবং বাকি টাকা ওই ব্যক্তি দেন।

তবে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আবদুস সোবাহান। তার দাবি, নামজারি ও দাখিলা বাবদ সব মিলিয়ে তিনি ২ হাজার ৬৭০ টাকা নিয়েছেন। ঘুষ লেনদেনের ভিডিও দেখানো হলেও নিজের বক্তব্যে অনড় থাকেন তিনি।

আবদুস সোবাহানের বিরুদ্ধে এর আগেও মোটা অঙ্কের টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। পটুয়াখালী সদর উপজেলার মৌকরণে দায়িত্ব পালনকালে রাঙ্গাবালী উপজেলার বড়বাইশদিয়া ইউনিয়নের গাব্বুনিয়া গ্রামের একটি পরিবারের ২৬ একর জমির বিএস রেকর্ড সংশোধন করে দেওয়ার কথা বলে প্রায় ২০ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ করেন পরিবারের সদস্য আতিকুর রহমান খান।

আতিকুরের দাবি, টাকা নেওয়ার পর সোবাহান যে কাগজ তৈরি করে দিয়েছিলেন, পরবর্তীতে সে কাগজ জাল বলে প্রমাণিত হয়। টাকা ফেরত চাইলে উল্টো তাদের বিরুদ্ধে ২০ লাখ টাকা চাঁদাবাজির মামলা করা হয়। তবে সোবাহানের করা ওই মামলায় পুলিশের তদন্তে সোবাহানের নিজের অপকর্মই উন্মোচিত হয়। 

পুলিশের তদন্তে নগদ পাঁচ লাখ ও ব্যাংকের মাধ্যমে সাড়ে ১২ লাখ টাকা গ্রহণের প্রমাণ উঠে আসলে আদালত মামলাটি খারিজ করে দেয়। 

অভিযোগকারী আতিকুর রহমান খানের চাচা জাকির খান বলেন, সোবাহান তাদের দুঃসম্পর্কের আত্মীয়। সেই পরিচয়ের কারণে তাকে বিশ্বাস করেছিলেন তারা।

জাকির খানের ভাষ্য, ২৬ একর জমির বিএস রেকর্ড করে দেওয়ার কথা বলে ২৬ লাখ টাকা দাবি করেন। পরে ২০ লাখ টাকায় রাজি হন তারা। ধাপে ধাপে সোবাহানকে নগদ ৭ লাখ টাকা দেওয়া হয়। পরে আত্মীয়-স্বজনের পরামর্শে বাকি সাড়ে ১২ লাখ টাকা সোবাহানের নিজ নামে থাকা ব্যাংক হিসাবে জমা দেওয়া হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি প্রতারণা করেছেন এবং জাল পর্চা করে দিয়েছেন বলে অভিযোগ জাকিরের।

জাকির বলেন, এ ঘটনার পর তার বড় ভাই ও আতিকুরের বাবা আফজাল খান অসুস্থ হয়ে মারা যান। তিনি টাকা ফেরত পাওয়ার পাশাপাশি ঘটনার বিচার দাবি করেন।

জাকির খানের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য-প্রমাণ অনুযায়ী, ২০২১ সালে সোনালী ব্যাংকের পটুয়াখালী নিউটাউন শাখায় আবদুস সোবাহানের নিজ নামে থাকা হিসাব নম্বরে ৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা জমার তথ্য রয়েছে। এছাড়া সোবাহানের করা মামলার তদন্ত প্রতিবেদনেও নগদ ও ব্যাংকের মাধ্যমে সাড়ে ১৭ লাখ টাকা গ্রহণের তথ্য উঠে আসে বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

তবে এ অভিযোগও অস্বীকার করেছেন আবদুস সোবাহান। তার দাবি, ওই অর্থ কোনো কাজের বিনিময়ে নেয়া নয়। বরং বিষয়টি তার শ্বশুরবাড়ির দলিলসংক্রান্ত পারিবারিক লেনদেন।

এদিকে গত ৮ মার্চ রাঙ্গাবালীতে যোগদানের পর আবদুস সোবাহানকে কোনো অফিসিয়াল দায়িত্বে রাখা হয়নি এবং তার প্রশাসনিক আইডিও নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) নাজমুল হাসান।

নাজমুল হাসান বলেন, জেলা প্রশাসনের নির্দেশনায় তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ঘটনায় কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।