‘টানা সকাল ৯টা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত একা ক্লাস নেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আমরা তো মানুষ, রোবট নই।’ এভাবেই নিজের কষ্টের কথা বলছিলেন পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার দক্ষিণ চর বিশ্বাস সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক পারভেজ হাসান। শুধু পারভেজ নন, উপজেলার বিচ্ছিন্ন দুই ইউনিয়ন চর কাজল ও চর বিশ্বাসে শিক্ষক সঙ্কটের কারণে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা এখন খাদের কিনারে। স্থানীয়দের দাবি, সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন থেকেই বিশেষ নিয়োগ না দিলে এ সঙ্কটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, চর কাজল ও চর বিশ্বাসের ২৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অনুমোদিত শিক্ষক পদ রয়েছে ১৫৩টি। এর বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ৬৭ জন শিক্ষক। ফলে ৮৬টি পদই শূন্য। এসব বিদ্যালয়ে মোট পাঁচ হাজার ৫১১ জন শিক্ষার্থী থাকলেও অর্ধেকের বেশি শিক্ষক না থাকায় পাঠদান কার্যক্রম কোনো রকমে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। অধিকাংশ বিদ্যালয়ে দুই থেকে তিনজন শিক্ষক দিয়ে পুরো স্কুলের কার্যক্রম সামলাতে হচ্ছে।
২০২৩ ও ২০২৪ সালে এই দুই ইউনিয়নে মোট ১৭ জন শিক্ষক নিয়োগ পেলেও এরই মধ্যে তিন জন চাকরি ছেড়েছেন এবং ৯ জন অবসরে গেছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, এলাকাটি দুর্গম হওয়ায় বাইরের জেলা বা উপজেলা থেকে আসা শিক্ষকরা দুই-তিন বছরের বেশি থাকতে চান না।
উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মজনু মোল্লা বাস্তব চিত্র তুলে ধরে বলেন, নদীর ওপার থেকে এসে সঠিক সময়ে পাঠদান করা শিক্ষকদের জন্য কঠিন। এছাড়া তাদের থাকার ও খাওয়ার জায়গার সমস্যা রয়েছে। স্থানীয়ভাবে নিয়োগ দেওয়া গেলে এই সঙ্কট অনেকটা কমে যেতো।
মধ্য চর কাজল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আতিকুর রহমান মিলন জানান, এক ক্লাসের মধ্যে তিন শ্রেণির ৭০ থেকে ৮০ জন শিক্ষার্থীকে বসিয়ে পড়াতে হয়, যা কোনোভাবেই কার্যকর শিক্ষা নয়।
অভিভাবক শিলা আক্তার বলেন, শিক্ষক কম থাকায় আমাদের ছেলেমেয়েরা ঠিকভাবে পড়াশোনা করতে পারছে না। অনেকেই মাঝপথে পড়া ছেড়ে দিচ্ছে। আরেক অভিভাবক ইলিয়াস হোসেনের মতে, প্রধান শিক্ষক দাপ্তরিক কাজে ব্যস্ত থাকেন, ফলে একজন শিক্ষক দিয়ে বিদ্যালয় চালানো অসম্ভব। এর একমাত্র সমাধান বিশেষ নিয়োগ।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার উম্মে সালমা লাইজু বলেন, রাঙ্গাবালীর মতো এখানেও যারা দুর্গম এলাকায় কাজ করছেন, তারা ভাতা পাওয়ার যোগ্য। আমরা দুর্গম ভাতার জন্য সুপারিশ করবো। এছাড়া ৪৬ জন নতুন নিয়োগপ্রাপ্তের মধ্যে যতোটা সম্ভব এই চরাঞ্চলে দেওয়ার চেষ্টা করা হবে এবং বিশেষ নিয়োগের জন্য অফিসিয়ালভাবে লেখা হবে।
চরাঞ্চলবাসীর একটাই দাবি—শিক্ষার আলো পৌঁছে দিতে হলে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে এবং ইউনিয়ন ভিত্তিক বিশেষ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি জারি করতে হবে।