এক সৈকতেই সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত: রাঙ্গাবালীতে প্রকৃতির অপার বিস্ময়

একদিকে সাগরের বিস্তীর্ণ জলরাশি, অন্যদিকে নদীর বুক চিরে ছুটে চলা জেলে নৌকার সারি। কোথাও বালুচরে লাল কাঁকড়ার ছোটাছুটি, কোথাও ঝাউবনের পাতায় বাতাসের মৃদু দোলা; আবার কোথাও সবুজ বনের নীরবতা ভেঙে ভেসে আসে পাখির ডাক। জল, বন, বালু আর আকাশ—প্রকৃতির এমন চার রঙের মেলবন্ধনে পটুয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা রাঙ্গাবালী যেন সাগরের ক্যানভাসে আঁকা এক মায়াবী জলছবি। 

আজ ২৭ সেপ্টেম্বর, বিশ্ব পর্যটন দিবসে দেশের নানা প্রান্তের ভ্রমণপিপাসুদের নজর কেড়েছে একই সৈকতে দাঁড়িয়ে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার এই অনিন্দ্য সুন্দর ঠিকানা।

নগরের কোলাহল পেরিয়ে এখানে এলে সময়টা যেন একটু ধীর হয়ে আসে। পটুয়াখালীর এই দ্বীপ উপজেলার চার দ্বীপ—সোনারচর, হেয়ার আইল্যান্ড, জাহাজমারা ও তুফানিয়া যেন প্রকৃতি তার সৌন্দর্যের চারটি আলাদা অধ্যায় খুলে রেখেছে।

সোনারচরে বুনো সৌন্দর্য

গহীন সাগরের বুকে জেগে ওঠা সোনারচরে পা রাখলেই মনে হয়, সভ্যতার ব্যস্ত পৃথিবীটি যেন অনেক দূরে। আঁকাবাঁকা খালের দুপাশে ঘন সবুজ বনায়ন, গাছের ছায়া আর খালের শান্ত জল। বনের ফাঁকে দেখা যায় মহিষের পাল, ভাগ্য ভালো হলে দেখা মিলতে পারে হরিণেরও। মানুষের আনাগোনা কম থাকায় সোনারচরের সৌন্দর্য অনেকটাই বুনো ও নিজস্ব।

ঝাউবনের ছায়ায় হেয়ার আইল্যান্ড

সোনারচর পেরিয়ে কিছুটা এগোলেই হেয়ার আইল্যান্ড। বাতাসে ঝাউপাতার মৃদু শব্দ আর পাতার ফাঁক দিয়ে ভেসে আসা সাগরের নীলাভ জলরাশি নজর কাড়ে যে কারোর। এখানে পর্যটকদের জন্য গড়ে উঠেছে কটেজ ও তাঁবুতে থাকার সুযোগ। ফলে প্রকৃতির একান্তে রাত কাটানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।

লাল কাঁকড়ার রাজ্য জাহাজমারা-তুফানিয়া

জাহাজমারা ও তুফানিয়ার বিস্তীর্ণ বালিয়াড়িতে একসঙ্গে ছুটে বেড়ায় অসংখ্য লাল কাঁকড়া। মানুষের উপস্থিতি টের পেলেই মুহূর্তে তারা গর্তে লুকিয়ে পড়ে, আবার কিছুক্ষণ পরেই বেরিয়ে আসে। নিস্তব্ধ বালুচরে কাঁকড়াদের ছুটোছুটি, আকাশে পাখির ওড়াউড়ি আর সাগরের ঢেউ—সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক অনন্য দৃশ্য।

সম্ভাবনার সামনে যোগাযোগের দেয়াল

প্রকৃতির এমন বিপুল আয়োজনের পাশে রয়েছে যাতায়াত ও অবকাঠামোগত কিছু সীমাবদ্ধতা। সুগম নৌ-যোগাযোগ এবং পর্যাপ্ত অবকাঠামো না থাকায় রাঙ্গাবালীর পর্যটন সম্ভাবনা এখনো পুরোপুরি বিকশিত হয়নি। স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটনসংশ্লিষ্টরা চার দ্বীপকে ঘিরে একটি সমন্বিত পর্যটন জোন গড়ে তোলা এবং সরাসরি সি-ট্রাক বা দ্রুতগতির যাত্রীবাহী নৌযান চালুর দাবি জানিয়েছেন।

রাঙ্গাবালী ট্যুরিস্ট নিরাপত্তা কমিটির সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব খান বলেন, কুয়াকাটায় প্রতিবছর আসা বিপুলসংখ্যক পর্যটককে রাঙ্গাবালীর এসব দ্বীপে আনা সম্ভব হলে পুরো উপকূলীয় অঞ্চলের অর্থনীতি বদলে যেতে পারে। কিন্তু বড় বাধা যোগাযোগ। কুয়াকাটা থেকে সরাসরি নৌ-যোগাযোগ এবং দ্বীপগুলোতে মানসম্মত আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ জরুরি।

কুয়াকাটা ট্যুরিস্ট বোট মালিক সমবায় সমিতি লিমিটেডের সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমান শাহীন জানান, কুয়াকাটা থেকে নৌযানে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টার দূরত্বে অবস্থিত এই চার দ্বীপে এলে একই স্থানে দাঁড়িয়ে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার যে সুযোগ পর্যটকরা পাবেন, তা সত্যিই অসাধারণ।

এ বিষয়ে রাঙ্গাবালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাজমুল হাসান বলেন, সোনারচর, হেয়ার আইল্যান্ড, জাহাজমারা ও তুফানিয়া দ্বীপকে ঘিরে উপকূলীয় পর্যটনের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। পরিকল্পিত ও পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব হলে এই অঞ্চলটি দেশের পর্যটন মানচিত্রে অন্যতম আকর্ষণ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।