জাতীয় পতাকার নকশাকারদের মধ্যে অন্যতম শিব নারায়ণ দাসকে শেষ বিদায় জানালো কুমিল্লা।
রোববার বিকেল চারটার দিকে কুমিল্লা টাউনহল মাঠে তার কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান বিভিন্ন স্তরের মানুষ। এর আগে ঢাকা থেকে কুমিল্লার তালপুকুরপাড় বোনের বাড়িতে তার কফিন নেওয়া হয়েছিলো।
কুমিল্লা টাউনহল মাঠে জাতীয় পতাকার নকশাকার শিব নারায়ণের কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান, মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি ও কুমিল্লা সদর আসনের সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা হাজী আ.ক.ম বাহাউদ্দিন বাহার।
পরে কুমিল্লা সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসন, মহানগর আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সহযোগী সংগঠন, কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগ, কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপি, মহানগর বিএনপি, ভিক্টোরিয়া কলেজ রোবার স্কাউট, বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি, উদীচী কুমিল্লা, কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজ, কুমিল্লা মহানগর কৃষক লীগ, কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ, কমিউনিস্ট পার্টি কুমিল্লা জেলা, পূর্বাশা-মধুমিতা ও কচিকাঁচার মেলা, খেলাঘর কুমিল্লা, যুব ইউনিয়ন, কুমিল্লা ক্লাব, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠন ন্যাপ-গ্যারিলা পার্টি, জাকের হোসেন ফাউন্ডেশন, মোস্তফা কামাল ফাউন্ডেশন, ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউট, বন্ধু ফোরাম কুমিল্লা, জেলা স্বাস্থ্য বিভাগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন।
শুক্রবার (১৯ এপ্রিল) সকাল সোয়া ৯টার দিকে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি।
এর আগে শিব নারায়ণ রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকদের পরামর্শে দ্রুত তাকে বিএসএমএমইউতে ভর্তি করা হয়।
১৯৭০ সালের ছয় জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হলের (বর্তমান শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) ১১৬ নং কক্ষে রাত ১১টার পর পুরো পতাকার নকশা সম্পন্ন করেন। এ পতাকাই পরবর্তীতে ১৯৭১-এর দুই মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় উত্তোলিত হয়।
শিবনারায়ণ দাসের বাবা সতীশচন্দ্র দাশ কুমিল্লাতে আয়ুর্বেদ চিকিৎসা করতেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন পাকিস্তানি হানাদাররা তাকে ধরে নিয়ে হত্যা করে।
শিবনারায়ণ দাসের স্ত্রীর নাম গীতশ্রী চৌধুরী এবং সন্তান অর্ণব আদিত্য দাস।
১৯৭০ সালের সাত জুন ঢাকার পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত ছাত্রদের এক সামরিক কুচকাওয়াজে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অংশ গ্রহণের কথা ছিল। এই জন্য ছাত্রদের নিয়ে একটি জয়বাংলা বাহিনী, মতান্তরে 'ফেব্রুয়ারি ১৫ বাহিনী' গঠন করা হয়। ছাত্র নেতারা এই বাহিনীর একটি পতাকা তৈরির সিদ্ধান্ত নেয়।
১৯৭০ সালের ছয় জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের (তৎকালীন ইকবাল হল) ১০৮ নং কক্ষে ছাত্রলীগ নেতা আ স ম আবদুর রব, শাহজাহান সিরাজ, কাজী আরেফ আহমদ, মার্শাল মনিরুল ইসলাম পতাকার পরিকল্পনা নিয়ে বৈঠকে বসেন।
এ বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন ছাত্রলীগ নেতা স্বপন কুমার চৌধুরী, জগন্নাথ কলেজের ছাত্রলীগ নেতা নজরুল ইসলাম, কুমিল্লা জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় ছাত্রনেতা শিবনারায়ন দাস, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ সাধারণ সাধারণ সম্পাদক হাসানুল হক ইনু ও ছাত্রনেতা ইউসুফ সালাউদ্দিন।
সভায় কাজী আরেফের প্রাথমিক প্রস্তাবনার ওপর ভিত্তি করে সবার আলোচনার শেষে সবুজ জমিনের ওপর লাল সূর্যের মাঝে হলুদ রঙের বাংলার মানচিত্র খচিত পতাকা তৈরির সিদ্ধান্ত হয়। কামরুল আলম খান (খসরু) তখন ঢাকা নিউ মার্কেটের এক বিহারী দর্জির দোকান থেকে বড় এক টুকরো সবুজ কাপড়ের মাঝে লাল একটি বৃত্ত সেলাই করে আনলেন; এরপর প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কায়েদে আজম হল (বর্তমানে তিতুমীর হল)-এর ৩১২ নং কক্ষের এনামুল হকের কাছ থেকে অ্যাটলাস নিয়ে ট্রেসিং পেপারে আঁকা হলো পূর্ব পাকিস্তানের মানচিত্র। শিবনারায়ণ দাস পরিশেষে তার নিপুণ হাতে মানচিত্রটি আঁকলেন লাল বৃত্তের মাঝে, এমনি করে রচিত হলো 'ফেব্রুয়ারি ১৫ বাহিনী'র পতাকা, যা কিছুদিন পর স্বীকৃত হয় বাংলাদেশের প্রথম পতাকা হিসেবে।
১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবসে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন স্থানে পাকিস্তানের জাতীয় পতাকার পরিবর্তে শিবনারায়ন দাশের নকশা করা বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়।
১৯৭২ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার শিবনারায়ন দাসের নকশা করা পতাকার মধ্যে মানচিত্রটি বাদ দিয়ে পতাকার মাপ, রঙ, ও তার ব্যাখ্যা সংবলিত একটি প্রতিবেদন দিতে বলে পটূয়া কামরুল হাসানকে। কামরুল হাসান দ্বারা পরিমার্জিত রূপটিই বর্তমানে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা।
শিবনায়ণ দাস তার মরদেহ বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে দান করে গেছেন।