তাহলে আমরা কোথায় নিরাপদ’: চট্টগ্রামে সমাবেশে প্রশ্ন

ইসকন চট্টগ্রাম পুণ্ডরিক ধামের অধ্যক্ষ চিন্ময়কৃষ্ণ দাশ ব্রহ্মচারী বলেন, অধিকার নিয়ে কথা বললে আমাদের উগ্রবাদী আখ্যা দিয়ে আওয়ামী লীগ ও ভারতের দালাল বলা হয়। নিজেদের মন্দির বিগ্রহ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করলে আমাদের মসজিদে আক্রমণকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। তাহলে আমরা কোথায় নিরাপদ?

শুক্রবার বিকালে নগরীর জামালখান মোড়ে সমাবেশে সারাদেশে মঠ-মন্দিরে হামলা ও ‘সংখ্যালঘু’ নির্যাতন বন্ধসহ আট দফা দাবিতে করা সমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন।

সরকারকে উদ্দেশ্য করে চিন্ময়কৃষ্ণ বলেন, বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছেন, তাদের ফেরত পাঠানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু বিগত সময়ে যারা বাংলাদেশ থেকে ভারত কিংবা অন্যদেশে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে, তাদের কাউকে তো ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়নি।

তিনি বলেন,  একজন উপদেষ্টা বলেছেন, বাংলাদেশে সংখ্যালঘুরা নিরাপদ। তাকে আমি বলতে চাই, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের দিকে তাকালে বুঝতে পারবেন আমরা কতো ভালো আছি… । চার হাজার একর সম্পত্তি এখন দুই হাজার একর হয়েছে। জাতীয় তীর্থের যদি এ অবস্থা হয়, তাহলে সাধারণ হিন্দুদের কী অবস্থা! আপনারা বুঝতে পারছেন?

সম্প্রতি প্রথম আলোতে প্রকাশিত ১০৬৮টি মন্দিরে হামলার খবরের প্রসঙ্গ টেনে চিন্ময়কৃষ্ণ বলেন, গত সরকারের আমলে এ প্রথম আলোকে প্রগতিশীলতার প্রতীক বলতেন। এখন প্রথম আলো সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর এক হাজার ৬৮টা ঘটনা উপস্থাপন করেছে। মঠ মন্দির ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য দিয়েছে। কিন্তু আজকে কেন প্রথম আলোর প্রতিবেদন আমলে নিচ্ছেন না?

দুর্গাপূজার আগে জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন এলাকায় মঠ মন্দিরে হামলার ক্ষয়-ক্ষতি নিরূপণ করে প্রজ্ঞাপন জারি এবং পূজার ছুটি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে পুণ্ডরিক ধাম অধ্যক্ষ বলেন, আগামী ১৫ দিন দেখবো। ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের অনুরোধ করবো তা নিশ্চিত করুন। যদি তা না হয়, গণ অনশন, অবস্থান কর্মসূচি করবো। আমরা ঘরে ফিরে যাবো না। 

খুলনার উৎসব মণ্ডলসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ধর্ম অবমাননার অজুহাতে আইসিটি অ্যাক্টে যাদের গ্রেপ্তার করে নির্যাতন করা হয়েছে, বিচার বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে তাদের বিচার দাবি করেন চিন্ময়। 

চিন্ময়কৃষ্ণ বলেন, প্রতিটা ধর্মের প্রতি আমরা শ্রদ্ধাশীল, আমরা সম্মান করি। বাংলাদেশে মসজিদ, মাজারে হিন্দুদের ব্যাপক অংশগ্রহণ রয়েছে। কিন্তু আমাদের ধর্মকে নিয়ে যখন অবমাননা করে, আমাদের দেবতা নিয়ে যখন ওয়াজ হয়, উসকানি দেওয়া হয়, তখন ধর্ম অবমাননা হয় না, মামলা হয় না।

সম্প্রতি চট্টগ্রাম নগরীর একটি ঘটনা তুলে ধরে তিনি বলেন, পুলিশ প্রশাসন বলছে, ওই দিনের ঘটনায় কেউ অভিযোগ করে নাই। কিন্তু অনেক ঘটনায় প্রশাসন নিজে বাদি হয়ে মামলা করেছে, কিন্তু হিন্দু ধর্মের বেলায় তাদের বাদি বানিয়ে বলির পাঁঠা বানানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। ওই সব চেষ্টা বন্ধ করতে হবে।

২০২১ সালের দুর্গাপূজার সময় কুমিল্লায় কথিত কোরআন অবমাননার অভিযোগ তুলে সারাদেশে হিন্দুদের মঠ-মন্দিরে হামলার প্রসঙ্গ টেনে চিন্ময়কৃষ্ণ ব্রহ্মচারী বলেন, আমরা তখন আন্দোলন করেছিলাম। সরকারি, বিরোধী সমস্ত রাজনৈতিক দল আমাদের এখানে এসে সংহতি জানিয়েছিল। আমরা আমাদের অধিকারের জন্য কথা বলেছি। বিচার ব্যবস্থাকে সমুন্নত রাখার জন্য আমরা আন্দোলন করেছি।

“আজকে ২১ সাল থেকে ২৪ সাল এলো, নতুন সরকার দায়িত্ব নিলো, কই ২১ সালের ঘটনার জন্য তো কোনো কমিশন হয়নি? তাহলে আমরা কী বুঝবো? আপনারা সকলে পরস্পরের মাসতুত ভাই। আপনারা যেহেতু পরস্পরের বিরুদ্ধে কথা বলেন, তাহলে আপনারা ২১ সালের ঘটনা নিয়ে কমিশন গঠন করুন, বিচারের ব্যবস্থা গ্রহণ করুন।”

সমাবেশে জানানো হয়, আগামী এক মাস দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা, পাড়া ও মহল্লায় আট দফা দাবির সমর্থনে গণসংযোগ হবে। দুর্গাপূজার আগে আট দফা দাবি বাস্তবায়নের বিষয়ে দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে কঠোর আন্দোলন করা হবে বলে সমাবেশে ঘোষণা দেন বক্তারা।

বিকেল তিনটার আগে থেকে জামালখান চত্বরে অবস্থান নেন সমাবেশে অংশগ্রহণকারীরা। এ সময় বৃষ্টি শুরু হলেও ছাতা হাতে অবস্থান নেন তারা। 

সনাতন সম্প্রদায়ের আট দফা দাবির মধ্যে রয়েছে- 

  • সরকার পতনের পর সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনাগুলো দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে বিচার করা
  • সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা, 
  • সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন প্রণয়ন, সংখ্যালঘুবিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন
  • হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টকে হিন্দু ফাউন্ডেশনে উন্নীত করা
  • বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টকেও ফাউন্ডেশনে উন্নীত করা
  • দেবোত্তর সম্পত্তি পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণ আইন প্রণয়ন
  • অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন যথাযথ বাস্তবায়ন
  • দুর্গাপূজায় ছুটি পাঁচ দিন করা