একাত্তরের অনুসন্ধান

পুষ্পা সিনেমার আদলে গাছ পাচারের নেপথ্যে যুবলীগ নেতা?

সিনেমার গল্প নয়, বাস্তব চিত্র। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের স্লুইস গেট সংলগ্ন ঝিরিপথ দিয়ে কাটা গাছ ভেসে আসার ঘটনা ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে পাচারকারী চক্র নিয়ে। একাধিক সূত্রে অভিযোগের তীর স্থানীয় এক যুবলীগ নেতার দিকে। লোকচক্ষুর আড়ালে থেকেও ভিন্ন লোকজন দিয়ে চালাচ্ছেন গাছ পাচার।

প্রতি বছরই ভারী বর্ষণে বিশ্ববিদ্যালয়ের ঝিরিপথের স্রোতে চবির অদূরে বিশ্ববিদ্যালয়ের বনাঞ্চল ও সরকারি বন থেকে পাচার হয় লক্ষ লক্ষ টাকার গাছ। এ বিষয়ে ছিলো না তেমন কোনো নজরদারি।

সূত্রমতে, এসব গাছ পাচার করতো স্থানীয় যুবলীগ নেতা হানিফের নেতৃত্বে একটি পাচারকারী চক্র।

জানা যায়, আওয়ামী সরকার পতনের পরেও এ যুবলীগ নেতার নেতৃত্বে গেলো বছর ২১ অক্টোবর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভয়ংকর হামলা হয়। হামলাকে কেন্দ্র করে মামলা হলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে হানিফ। লোকচক্ষুর বাইরে যাওয়ায় তার দখলদারিত্ব ও সন্ত্রাসী হামলা কমলেও কমেনি গাছ পাচার।

মাস দুয়েক আগে একাত্তরের কাছে খবর আসে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাস থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরের বনাঞ্চলে গাছ কেটে ঝিরির পাশে সেসব গাছের গুড়ি সাজিয়ে রাখা হয়েছে। সত্যতা যাচাইয়ে অনুসন্ধানে নামে একাত্তর ৷ সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় ক্যাম্পাসের অদূরে অন্তত পাঁচ থেকে সাত স্পটে গাছের গুড়ি কেটে রাখা হয়েছে৷ এছাড়াও বিভিন্ন পাহাড়ে মেলে নতুন করে কাটা গাছের গোড়া। এতে বনাঞ্চল ও পাহাড়ের গাছ কাটার বিষয়টি স্পষ্ট হয়।

প্রায় দুইমাস পর গত ১৮ জুন ভারী বর্ষণে ঝিরিপথগুলো পানিতে ফুলে ফেঁপে উঠলে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্লুইস গেট এলাকায় ভেসে আসতে দেখা যায় কাটা গাছের গুড়ি৷ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এ পথে গাছ পরিবহনে নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও গাছ ভেসে আসায় বিষয়টি শিক্ষার্থীরা প্রশাসনকে জানায়। বিশ্ববিদ্যালয়  প্রশাসন তাৎক্ষণিকভাবে এসব গাছ জব্দ করে।

ctg2

গাছগুলো জব্দ করার পর সামনে আসেন গাছ ক্রয়কারী ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আলী৷ এসব গাছ ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যে কোনো এক মালিকানাধীন জমি থেকে কাটা হয়েছে বলে দাবি তার। তবে বনাঞ্চল থেকে গাছগুলো কাটার জন্য তিনি দেখাতে পারেননি বন বিভাগের ছাড়পত্র ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ঝিরিপথ ব্যবহার করার জন্য অনুমতিসহ বৈধ কোনো কাগজপত্র।

তার দাবি, নতুন ব্যবসায়ে নামায় এসব বিষয় সম্পর্কে তিনি অবগত নন। এছাড়া কোনো ধরনের অসাধু চক্রের সাথেও তিনি জড়িত নন বলে জানান ব্যবসায়ী আলী।

এদিকে গাছ পাচারের বিষয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে মেলে ভিন্ন তথ্য। একাধিক সূত্র নিশ্চিত করে, লোকজনের আড়ালে গিয়েও ভিন্ন চক্রের সহায়তায় গাছ পাচার কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছেন স্থানীয় যুবলীগ নেতা হানিফ৷ গত রোববার বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিশ্ববিদ্যালয়ের বনাঞ্চল পরিদর্শনে যায়।

পরিদর্শন শেষে সহকারী প্রক্টর সাঈদ বিন কামাল একাত্তরকে বলেন, গাছ ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আলী যে জায়গা থেকে গাছ কেটেছে ওই জায়গার মালিক জানিয়েছে, এ জায়গা খাস জায়গা। যদিও পূর্বে তাদের বাপ-দাদারা এ জায়গায় গাছ লাগিয়েছে। তবে গাছ বৈধ বা অবৈধ হোক আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর দিয়ে গাছ নিতে হলে যে অনুমতি দরকার সে অনুমতি তিনি নেননি তাই তার গাছ জব্দ করা হয়েছে।

গাছ পাচার সম্পর্কে তিনি জানান, পূর্বে গাছ পাচারকারী একটি চক্র সক্রিয়ভাবে গাছ পাচারের সাথে জড়িত ছিলো। আমাদের সন্দেহ পূর্বের চক্রটি নতুন পরিচয়ে আবারও এ কাজের পুনরাবৃত্তি করতে পারে। আমাদের ধারণা  শুধু আলীর এসব গাছই নয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বনাঞ্চল ও সরকারি আরও গাছ কেটে পাচার করা হয়েছে। পূর্বের চক্রই ভিন্ন লোকজনের সহায়তায় গাছ পাচার চালু রেখেছে বলে সন্দেহ সংশ্লিষ্টদের।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য ড. কামাল উদ্দিন বলেন, জব্দ গাছগুলোর মালিক বৈধভাবে গাছ কাটার জন্য বনবিভাগের ছাড়পত্র ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর থেকে গাছ পরিবহন করতে কোনো অনুমতি নেয়নি৷ যে পথ দিয়ে গাছগুলো চালান দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, সেটি অবৈধ পথ।

তিনি বলেন, গাছকাটার স্থান পরিদর্শন শেষে আমাদের ধারণা কিছু গাছ হয়তো বিশ্ববিদ্যালয়ের বাহির থেকে কেটেছে এবং কিছু গাছ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর থেকে কেটেছে। আমরা এ বিষয়ে খতিয়ে দেখার জন্য তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। তদন্তের পর যদি এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পত্তি অবৈধভাবে অপসারণের কোনো তথ্য প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। যদি সরকারি গাছ কাটা হয় তবে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে জানানো হবে তারা আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

উপ-উপাচার্য আরো বলেন, এ গাছ পাচার নতুন নয়। পূর্বে একটি সক্রিয় চক্র প্রতিবছর গাছ পাচার করে আসছে। আমাদের সন্দেহ এই চক্রই হয়তো ভিন্ন পরিচয়ে গাছ পাচার করতে পারে। আমরা বিষয়টি তদন্ত করে জানতে পারবো।

ctg1

এ বিষয়ে বনবিভাগের হাটহাজারী রেঞ্জের ফরেস্ট রেঞ্জার সাইফুল ইসলাম একাত্তরকে জানায়, আমরা জানতে পেরেছি, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কিছু ভাসমান কাঠ আটক করেছে। যে এলাকা থেকে কাঠগুলো জব্দ করা হয়েছে, আমার জানামতে সেখানে আমাদের হাটহাজারী রেঞ্জের কোনো বনভূমি নেই। যদি এখানে বন আইনের পরিপন্থি অবৈধ কোনো কার্যকলাপ হয়ে থাকে, তাহলে সেক্ষেত্রে আমরা প্রশাসনের সহায়তায় বন আইন অনুসারে ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।

গাছ পাচারের সাথে জড়িত যুবলীগ নেতা হানিফের বিরুদ্ধে বর্তমানে হাটহাজারী থানায় আটটি মামলা রয়েছে। হামলাসহ নানান অপকর্মে জড়িত থাকায় এসব মামলা হয়। অভিযুক্ত এ নেতা এখনো প্রশাসনের ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকায় আরো অপকর্ম বাড়বে মনে মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল।