সীমানা পুনর্বিন্যাসে ক্ষোভ, তিন জেলায় মহাসড়ক অবরোধ

নির্বাচন কমিশনের নেয়া সংসদীয় আসন পুনর্বিন্যাসের সিদ্ধান্ত বদলের দাবিতে ফরিদপুর, পাবনা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মহাসড়ক অবরোধ করেছে সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী এলাকার লোকজন। তাদের সঙ্গে একাত্মতা জানিয়ে সামিল হয়েছেন স্থানীয় রাজনীতিকরাও। আন্দোলনকারীরা বলছেন, আসন পুনর্বিন্যাসের সিদ্ধান্ত বাস্তবসম্মত হয়নি। এতে মানুষের রাজনৈতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতা বাড়বে। 

ফরিদপুরে সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ করতে গিয়ে ভাঙ্গা উপজেলাকে বিভক্ত করার প্রতিবাদে শনিবার থেকেই অবস্থান কর্মসূচি ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছেন উপজেলার আলগি ও হামিরদি ইউনিয়নবাসী। রোববারও ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়েতে অবস্থান কর্মসূচি ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছেন বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা।

বেলা সাড়ে ১১টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত ভাঙ্গা বিশ্বরোড মোড়ে এক্সপ্রেসওয়েতে এ কর্মসূচির আয়োজন করে তারা। এর আগে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতা–কর্মীরা খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে বিশ্বরোড মোড়ে জড়ো হন। তারা জানান, ফরিদপুর-৪ আসন ভুক্ত আলগি এবং হামিরদি ইউনিয়নকে ফরিদপুর-২ আসনভুক্ত করা বাস্তবসম্মত হয়নি। 

গত বৃহস্পতিবার নির্বাচন কমিশনের গেজেটে ফরিদপুরের দুটি সংসদীয় আসনের সীমানা পরিবর্তন করা হয়। এর মধ্যে ফরিদপুর–৪ আসনের (ভাঙ্গা-সদরপুর–চরভদ্রাসন) ভাঙ্গা থেকে আলগী ও হামিরদী ইউনিয়ন বাদ দিয়ে ফরিদপুর–২ আসনের (নগরকান্দা-সালথা) সঙ্গে যুক্ত করা হয়। 

এ সিদ্ধান্তের পরপরই ভাঙ্গা উপজেলা বিএনপি ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করে। গত শুক্রবার এক্সপ্রেসওয়ে অবরোধে ঢাকা–বরিশাল ও ঢাকা-খুলনা মহাসড়ক দীর্ঘ সময় অবরোধ করা হয়।

রোববারের কর্মসূচিতে নেতা-কর্মীরা ‘ভাঙ্গা উপজেলার অঙ্গহানি, চলবে না, চলবে না’, ‘অ্যাকশন অ্যাকশন, ডাইরেক্ট অ্যাকশন’ ইত্যাদি স্লোগান দেন। মহাসড়কের পাশে কর্মসূচি করায় আজ যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটেনি। এতে অন্যদের মধ্যে উপজেলা বিএনপির সভাপতি খন্দকার ইকবাল হোসেন, সাধারণ সম্পাদক মো. আইয়ুব মোল্লা, ভাঙ্গা পৌর বিএনপির সাবেক সভাপতি মিজানুর রহমান প্রমুখ বক্তব্য দেন।

বিএনপির নেতা খন্দকার ইকবাল হোসেন বলেন, কোনো অবস্থাতেই ভাঙ্গার অঙ্গহানি করা চলবে না। আমরা অখণ্ড ভাঙ্গা চাই। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, তাঁদের দাবি না মানলে পুরো দক্ষিণবঙ্গ অচল করে দেওয়া হবে। তাঁরা তাঁদের নেতা জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম খানের নেতৃত্বে রাজপথে আন্দোলন গড়ে তোলার পাশাপাশি আইনিপ্রক্রিয়া অব্যাহত রাখবেন বলে জানান।

এদিকে, পাবনা-১ ও পাবনা-২ আসনের সীমানা পুনর্বিন্যাসের প্রতিবাদে পাবনার বেড়া উপজেলায় বিক্ষোভ সমাবেশ ও মানববন্ধন হয়েছে। আজ রোববার সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের উদ্যোগে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে কর্মসূচি পালিত হয়। এ সময় ঢাকা–পাবনা মহাসড়ক অবরোধ করায় শত শত যানবাহন আটকা পড়ে।

সকাল থেকেই বেড়ার বিভিন্ন এলাকা থেকে মিছিল নিয়ে লোকজন সিঅ্যান্ডবি বাসস্ট্যান্ডে জড়ো হন। এ সময় টায়ার জ্বালিয়ে মহাসড়ক অবরোধ করে তাঁরা সীমানা পুনর্বিন্যাস বাতিলের দাবি জানান। তাঁদের দাবি, বেড়া উপজেলাকে পৃথকভাবে সুজানগরের সঙ্গে যুক্ত করা হলেও এই এলাকার মানুষ ব্যবসা–বাণিজ্য ও নানা কারণে সাঁথিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। বিক্ষোভ চলাকালে বেড়া বাজারের দোকানপাট ও যান চলাচল বন্ধ ছিল।

সমাবেশে বক্তারা বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে পাবনা-১ আসনে সাঁথিয়া উপজেলা ও বেড়া পৌরসভাসহ চারটি ইউনিয়ন ছিল। পাবনা-২ আসনে ছিল বেড়ার অন্য পাঁচটি ইউনিয়ন ও সুজানগর। কিন্তু সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনের তালিকা অনুযায়ী পাবনা-১ আসনে শুধু সাঁথিয়া এবং পাবনা-২ আসনে বেড়া ও সুজানগরকে একীভূত করা হয়েছে। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেন বেড়ার সাধারণ মানুষ।

স্থানীয় লোকজনের দাবি, ভৌগোলিকভাবে বেড়া পৌরসভা ও এর পাশের চারটি ইউনিয়ন সাঁথিয়ার কাছাকাছি। সাঁথিয়া উপজেলা সদর থেকে বেড়া সদরের দূরত্ব মাত্র আট কিলোমিটার, যেখানে সুজানগরের সঙ্গে দূরত্ব প্রায় ৪০ কিলোমিটার। ফলে সীমানা পুনর্বিন্যাসকে তাঁরা অযৌক্তিক বলে দাবি করেন।

অন্যদিকে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলার দুটি ইউনিয়নকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসন থেকে কেটে নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে অন্তর্ভুক্ত করার প্রতিবাদে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক অবরোধ করেছেন স্থানীয়রা। রোববার সকাল ১০টা থেকে মহাসড়কের চান্দুরা এলাকায় অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন তারা। ফলে মহাসড়কের উভয় পাশে যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়। তীব্র যানজটে চরম ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রীরা।

বিক্ষোভকারীরা বলেন, বিজয়নগর উপজেলার ১০টি ইউনিয়ন দীর্ঘদিন ধরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ (সদর দক্ষিণ ও বিজয়নগর) আসনের অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত গেজেটে চান্দুরা ও বুধন্তী ইউনিয়নকে আলাদা করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল-আশুগঞ্জ) আসনে যুক্ত করা হয়েছে। এ সিদ্ধান্তের ফলে বিজয়নগর বিভক্ত হচ্ছে, যা তারা কোনোভাবেই মেনে নেবেন না।

আন্দোলনকারীরা আরও বলেন, বিজয়নগরের মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে উন্নয়নের স্বপ্ন দেখে। কিন্তু এই আসন পুনর্বিন্যাস আমাদের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি করবে। ভৌগোলিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে বিজয়নগর এক ও অভিন্ন। চান্দুরা ও বুধন্তীকে কেটে অন্য আসনে দেওয়া সম্পূর্ণ অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত। আমরা চাই, অখণ্ড বিজয়নগরকে পূর্বের মতো ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনের অধীনে রাখা হোক।