টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে রাঙামাটির বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। জেলার বন্যা পরিস্থিতির কোথাও কোথাও কিছুটা উন্নতি হলেও দুর্গত মানুষের দুর্ভোগ এখনও কাটেনি। অনেক এলাকা থেকে পানি নামতে শুরু করলেও ঘরবাড়ি বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ায় হাজারো মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে দিন কাটাচ্ছেন। ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক, ভেঙে পড়া ঘরবাড়ি আর চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন পার করছেন বানভাসি মানুষ।
এদিকে পাহাড়ে হালকা ও মাঝারি বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় নতুন করে বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। রাঙামাটিতে এখনো কয়েক হাজার পরিবার পানিবন্দী অবস্থায় রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি এই সঙ্কট থেকে মুক্তি পেতে স্থানীয় বাসিন্দারা এখন খাল কাটাসহ বন্যার স্থায়ী সমাধান চাইছেন।
স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি বন্যায় রাঙামাটিসহ তিন পার্বত্য জেলায় প্রায় ৩৫ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। পাহাড়ধস ও ঢলের পানিতে ভেসে গিয়ে এ পর্যন্ত অন্তত ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় চার শতাধিক আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে, যেখানে বর্তমানে প্রায় ১১ হাজার মানুষ অবস্থান করছেন। এর মধ্যে শুধু রাঙামাটি জেলার ৪০টি আশ্রয়কেন্দ্রে এ পর্যন্ত তিন হাজার ৫২৪ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাঙামাটির বাঘাইছড়ি, বিলাইছড়ি, বরকল ও জুরাছড়ি উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। ঘরবাড়ি, কৃষিজমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় স্থবির হয়ে পড়েছে জনজীবন। পাহাড়ি ঢলে সাজেক-বাঘাইহাট সড়কের মাচালং এলাকায় সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় বাঘাইছড়ির সঙ্গে পর্যটনকেন্দ্র সাজেকের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।
এছাড়া মারিশ্যা-দীঘিনালা সড়কের ‘তিন কিলো’ নামক স্থানে রাস্তার একটি বড়ো অংশ ধসে পড়ায় বাঘাইছড়ি উপজেলার সঙ্গে সার্বিক সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহন ও জরুরি যাতায়াত স্বাভাবিক করতে ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলো দ্রুত মেরামতের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
বন্যা কবলিত অনেক পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে উঠলেও অনেকেই নিজের ভিটেমাটিতেই পানিবন্দী অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন। দুর্গত এলাকায় দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ খাবার পানি ও খাদ্যের তীব্র সঙ্কট। একই সঙ্গে শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে পানিবাহিত রোগের শঙ্কা বাড়ছে। দুর্গম কিছু এলাকায় এখনো পর্যাপ্ত ত্রাণ পৌঁছায়নি বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তারা দ্রুত পর্যাপ্ত ত্রাণ, নিরাপদ পানি ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে স্থানীয় প্রশাসন। দুর্গত এলাকায় সেনাবাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। অনেক জায়গায় ইতিমধ্যে শুকনো খাবার ও সরকারি সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রীর জরুরি ত্রাণ তহবিল থেকে ২০ লাখ টাকা অনুদান দেওয়া হয়েছে। এছাড়া প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রতিটি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডে মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে বলে জানান রাঙ্গামাটির জেলার প্রশাসক নাজমা আশরাফি।
সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি দুর্গত মানুষের সহায়তায় স্থানীয় বাসিন্দারাও এগিয়ে এসেছেন। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।