‘আমার ছেলের বয়স যখন মাত্র দুই বছর, তখন সে এই এলাকায় এসেছে। অপ্রতিম আপনাদের কাছেই বড় হয়েছে, আপনাদের আদর-স্নেহ পেয়েছে, আপনাদের বাসায় খেয়েছে। তাই আজ আপনাদের কাছেই আমার অপ্রতিমকে সোপর্দ করছি, সমাহিত করছি।’ একমাত্র সন্তানকে হারানোর নির্মম যন্ত্রণা বুকে চেপে কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন ব্যবসায়ী কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম ও কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার দম্পতির ১৩ বছর বয়সী একমাত্র সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের দ্বিতীয় জানাজার আগে কোটবাড়ির গন্ধমতি ঈদগাহ মাঠে হৃদয়বিদারক এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। স্বজন, প্রতিবেশী আর বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের চোখের পানিতে বুক ভাসিয়ে স্থানীয় কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয় কুমিল্লা বর্ডারগার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির এই মেধাবী শিক্ষার্থীকে।
রোববার সকাল ১০টায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মাঠে অপ্রতিমের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা ও দাফনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী, অপ্রতিমের সহপাঠী এবং স্থানীয়দের ঢল নামে। পুরো বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে তখন এক বিষাদময় নীরবতা।
প্রথম জানাজার আগে ছেলের হত্যার বিচার চেয়ে শোকার্ত বাবা বলেন, ‘আমার ছেলের হত্যার সুষ্ঠু ও ন্যায়বিচার চাই। আমাদের বর্তমান বিচার ব্যবস্থার প্রতি আমার পূর্ণ আস্থা আছে। এই আস্থাটা যেন কোনোভাবেই ভেঙে না যায়। আমার বিশ্বাস, এই আস্থা ভাঙবে না এবং আমি ন্যায়বিচার পাব।’ দাফনের পর বুকফাটা আর্তনাদ করে তিনি আরও বলেন, ‘আর কোনো বাবাকে যেন আমার মতো সন্তান হারাতে না হয়। বাবার কাঁধে যে সন্তানের লাশের ভার কতটা কষ্টের, তা আমি আজ হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করছি’।
সামান্য একটি আইফোনের লোভে এভাবে অবুঝ সন্তানকে প্রাণ দিতে হবে, তা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না নিহতের পরিবার ও স্বজনেরা।
আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বাবা ফিরোজ শাহরিয়ার আফসোস করে বলেন, ‘সামান্য একটা আইফোনের জন্য আমার নিষ্পাপ ছেলেটাকে এভাবে মেরে ফেলা হলো, এই কথা আমার মন কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না। আমার ১৩ বছর বয়সী ছোট্ট ছেলেটা তো কারও কোনো ক্ষতি করেনি, কোনো অপরাধ করেনি। তবে কেন তাকে এভাবে নির্মমভাবে প্রাণ দিতে হলো?’ তিনি অপরাধীদের কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি ন্যায়বিচারের আকুল আবেদন জানান।
পরিবারিক সূত্রে জানা যায়, গত শুক্রবার বিকেলে কোটবাড়ি গন্ধমতির বাসা থেকে মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বের হয়েছিল অপ্রতিম। এরপর আর সে বাসায় ফেরেনি। বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করে না পেয়ে ওই দিনই সদর দক্ষিণ থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়।
পুলিশ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও পরিবারের নিবিড় খোঁজাখুঁজির প্রায় ২১ ঘণ্টা পর শনিবার দুপুরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন লালমাই পাহাড়ঘেঁষা সানন্দা এলাকার একটি নির্জন জঙ্গল থেকে অপ্রতিমের নিথর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরম মমতায় বেড়ে ওঠা যে শিশুটি পুরো ক্যাম্পাসের আনন্দ ছড়িয়ে বেড়াত, আজ চিরতরে ঘুমিয়ে পড়ে সে রেখে গেল কেবলই বিষাদময় স্মৃতি আর এক শোকাতুর পরিবেশ।