ঢাকার সাভারে গত ছয় মাসে সংঘটিত ছয়টি নৃশংস হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ। ছদ্মবেশী ভবঘুরে মশিউর রহমান খান সম্রাট ওরফে ‘সাইকো সম্রাট’ (৪০)-কে গ্রেপ্তারের পর বেরিয়ে এসেছে একের পর এক রোমহর্ষক তথ্য। সিসিটিভি ফুটেজের সূত্র ধরে গ্রেপ্তার হওয়া এই যুবক প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এবং পরবর্তীতে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে ছয়জনকেই একাই খুনের কথা স্বীকার করেছেন।
সোমবার দুপুরে সাভার মডেল থানায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম, অপস অ্যান্ড ট্রাফিক) আরাফাতুল ইসলাম এই তথ্য নিশ্চিত করেন।
সিসি ক্যামেরায় যেভাবে ধরা পড়ল খুনি
পরিত্যক্ত সাভার পৌর কমিউনিটি সেন্টার ও এর আশপাশ থেকে একের পর এক মরদেহ উদ্ধার হতে থাকায় পুলিশের পক্ষ থেকে নজরদারি বাড়ানো হয়। পৌরসভার সহায়তায় সম্প্রতি ওই পরিত্যক্ত ভবনে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়। গত শনিবার রাতে এক কিশোরীসহ দুজনকে হত্যার পর মরদেহ পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় সিসিটিভি ফুটেজে সম্রাটের সন্দেহজনক উপস্থিতি দেখা যায়। এর সূত্র ধরেই গত রোববার বিকেলে সাভার থানা রোডের সামনে থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ।
খুনের তালিকা ও সম্রাটের ‘কিলিং মিশন’
পুলিশের তদন্ত ও আসামির স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, সম্রাট প্রথম খুনটি করেন ২০২৫ সালের ৪ জুলাই। সাভার মডেল মসজিদের পাশে আসমা বেগম (৭৫) নামে এক বৃদ্ধাকে শ্বাসরোধ করে হত্যার মাধ্যমে তার এই ‘কিলিং মিশন’ শুরু হয়। এরপরের পাঁচ হত্যাকাণ্ডই তিনি ঘটান পরিত্যক্ত পৌর ভবনটির ভেতর।
২০২৫ সালের ২৯ আগস্ট এক যুবকের হাত-পা বেঁধে হত্যার পর মরদেহ পুড়িয়ে দেওয়া হয়। একই বছরের ১১ অক্টোবর দ্বিতীয় তলার বাথরুম থেকে অজ্ঞাত এক নারীর গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার। ১৯ ডিসেম্বর আরও এক অজ্ঞাত যুবকের পোড়া মরদেহ উদ্ধার। এরপর, গেল ১৭ জানুয়ারি রাতে এক কিশোরী (১৩) ও এক যুবককে (২৫) হত্যার পর মরদেহ পুড়িয়ে দেওয়া হয়।
ভবঘুরে বেশে ‘সাইকো’ কিলার
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জানান, সম্রাট নিজেকে ব্যাংক কলোনি এলাকার বাসিন্দা দাবি করলেও পুলিশ সেখানে তাঁর কোনো স্থায়ী ঠিকানার খোঁজ পায়নি। তিনি মূলত ভবঘুরের মতো সাভারের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বেড়াতেন। পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে তাঁর মধ্যে দৃশ্যত কোনো মানসিক ভারসাম্যহীনতার লক্ষণ পাওয়া যায়নি, তবে তাঁর নৃশংসতার ধরন দেখে তাঁকে ‘সাইকো’ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গ্রেপ্তার সম্রাটের ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে পাঠানো হলে বিচারক তাঁকে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেওয়ার জন্য খাস কামরায় নিয়ে যান। সম্রাট হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করলেও নিহত ছয় জনের মধ্যে ৫ জনের পরিচয় এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডে সম্রাটের সঙ্গে আর কেউ জড়িত ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
সাভারের পরিত্যক্ত ওই কমিউনিটি সেন্টারটি অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হওয়ায় স্থানীয় জনমনে দীর্ঘদিনের যে আতঙ্ক ছিলো, সম্রাটের গ্রেপ্তারে তা কিছুটা হলেও লাঘব হয়েছে।