মানসিক অবসাদ আর ক্লান্তিতে ভেঙে পড়া চোখ দুটোয় কেবলই শূন্যতা। কখনও আনমনে চেয়ে থাকেন তেঁতুলবাড়িয়া সীমান্তের কাঁটাতারের দিকে, কখনও আবার ডুকরে কেঁদে ওঠেন অজানা কোনো আতঙ্কে। গত একটা সপ্তাহ ধরে মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার কাজীপুর ও বামুন্দি ইউনিয়নের পীরতলা গ্রামের মানুষের কাছে এই দৃশ্যটি চেনা হয়ে উঠেছে। এই চেনা মুখের অচেনা মানুষটি হলেন রোজিনা খাতুন রোমানা (৩০)।
গত ছয় জুন ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কর্তৃক পুশইনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন এই তরুণী। এরপর থেকে একটি নিরাপদ আশ্রয় আর নিজের আপনজনদের কাছে ফেরার আকুলতা নিয়ে মেহেরপুরের এ গ্রাম থেকে ও গ্রামে ঘুরে বেড়াচ্ছেন তিনি। মুখে দাবি করছেন তার বাড়ি চট্টগ্রামে, কিন্তু এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও প্রশাসনের খাতায় তার সেই ঠিকানার সত্যতা এখনও যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে অনিশ্চয়তা নিয়ে দিন কাটছে ‘দপ্তরিক পরিচয়হীন’ এই নারীর।
আমবাগান থেকে পীরতলায় এক ছন্নছাড়া নারী
স্থানীয় বাসিন্দা ও সীমান্তবাসীদের সূত্রে জানা যায়, গত ছয় জুন ভোরে তেঁতুলবাড়িয়া সীমান্ত দিয়ে কয়েকজন নারী ও শিশুকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে বিএসএফ। বিজিবি ও গ্রামবাসীর বাধায় সেই পুশইনের চেষ্টা ব্যর্থ হলেও, একই সময়ে সীমান্তের অন্য একটি পয়েন্ট দিয়ে একা বাংলাদেশে ঢুকে পড়েন রোজিনা। সীমান্ত পার হয়েই আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে একটি আমবাগানে লুকিয়ে ছিলেন তিনি।
এরপর থেকে গত সাত দিন ধরে গাংনীর বিভিন্ন মেঠো পথ ধরে উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটছেন রোজিনা। বর্তমানে কাজীপুর ইউনিয়নের পীরতলা গ্রামের এক মানবিক গৃহিণীর ঘরের বারান্দায় সাময়িক ঠাঁই হয়েছে তার। দীর্ঘদিনের মানসিক নির্যাতন ও এক সপ্তাহের এই যাযাবর জীবনের ক্লান্তি তাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। গ্রামবাসী জানান, রোজিনা মাঝে মাঝে খুব স্বাভাবিকভাবে কথা বলেন, আবার পরক্ষণেই একদম চুপ হয়ে যান, যেন কোনো এক অতল আতঙ্কে তলিয়ে যান তিনি।
ওপারে তিন বছরের অন্ধকার, এপারে শুধুই অপেক্ষা
পীরতলা গ্রামের মানুষের সঙ্গে কথা বলার সময় রোজিনা ভাঙা ভাঙা কণ্ঠে নিজের যে পরিচয় দিয়েছেন তা হলো- তার বাড়ি চট্টগ্রামের পটিয়া এলাকায়। বাবার নাম আব্দুল খালেক, মায়ের নাম ফাতেমা এবং ভাইয়ের নাম আব্দুর রহমান।
কীভাবে তিনি সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ওপারে গিয়েছিলেন, সেই ধোঁয়াশা কাটেনি। তবে তিনি জানিয়েছেন, ভারতের কোনো এক কারাগারে দীর্ঘ তিন বছর বন্দি জীবন কাটিয়েছেন তিনি। কারাগারের সেই অন্ধকার অধ্যায় শেষ হতে না হতেই গত সপ্তাহে বিএসএফ তাকে মেহেরপুর সীমান্ত দিয়ে জোর করে পুশইন করে। নিজের দেশে ফিরলেও, নিজের চেনা মানুষগুলোর কাছে পৌঁছাতে না পারার এক অদ্ভুত যন্ত্রণায় পুড়ছেন তিনি।
মানবিকতার হাত বনাম দীর্ঘমেয়াদি শঙ্কা
পীরতলা গ্রামের বাসিন্দা টগর খাতুন বলেন, পাঁচ-ছয় দিন ধরে মেয়েটাকে আমাদের এলাকায় উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরতে দেখে ঘরে ডেকে এনেছি। কথা বলে জানলাম সে ভারত থেকে এসেছে, বাড়ি চট্টগ্রামে। মানুষ হিসেবে তো ফেলে দিতে পারি না, তাই একটু খাওয়া-দাওয়া দিচ্ছি। কিন্তু আমাদের মতো গরিব মানুষের পক্ষে দীর্ঘদিন একটা অচেনা মানুষের দায়িত্ব নেওয়া তো সম্ভব না।
একই উদ্বেগ প্রকাশ করলেন স্থানীয় যুবক রাকিবুল ইসলাম। তিনি বলেন, ২৭ থেকে ৩০ বছর বয়সী একটি মেয়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থায় এভাবে গ্রামে গ্রামে ঘুরছে। আমরা পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসনকে জানিয়েছি। একজন একা নারীর জন্য এভাবে খোলা পরিবেশে থাকা কতোটা ঝুঁকিপূর্ণ, তা আমরা সবাই জানি। যেকোনো দুর্ঘটনা ঘটার আগেই তার স্থায়ী নিরাপত্তা নিশ্চিত করা দরকার।
প্রশাসনের আশ্বাস: কবে মিলবে ঠিকানা?
রোজিনাকে তার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিতে প্রশাসনের উদ্যোগ কদোটুকু? জানতে চাইলে গাংনী উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা আরশাদ আলী জানান, রোজিনার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কিছু প্রাথমিক বিবরণ তারা নোট করেছেন। তবে অফিস খোলার পর চট্টগ্রামের পটিয়া প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করে এই ঠিকানা যাচাই করা হবে। পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেলে বিজিবির সহায়তায় তাকে পরিবারের কাছে পাঠানো হবে, অন্যথায় তার ঠাঁই হবে সরকারি কোনো পুনর্বাসন কেন্দ্রে।
গাংনী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন জানান, বিষয়টি তারা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। রোজিনার নাগরিকত্ব ও পরিচয় নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া চলছে এবং একই সঙ্গে তার সার্বিক নিরাপত্তার দিকেও প্রশাসনের নজর রয়েছে।
গাংনীর পীরতলা গ্রামের মেঠো পথের ধারে বসে রোজিনা হয়তো এখনও ভাবছেন চট্টগ্রামের পটিয়ার সেই চেনা উঠোনটির কথা; যেখানে তার মা ফাতেমা কিংবা ভাই আব্দুর রহমান হয়তো তার পথ চেয়ে আছেন। সীমান্ত আর আমবাগানের অনিশ্চিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে রোজিনা কি ফিরতে পারবেন তার চেনা আশ্রয়ে? এই প্রশ্নের উত্তর এখন লুকিয়ে আছে প্রশাসনের টেবিলে থাকা ফাইল আর ঠিকানা যাচাইয়ের দাপ্তরিক গতির ওপর।