‘নুন আনতে পান্তা ফুরানো’ ঘরের মেয়েটিই এখন দেশের দ্রুততম মানবী

গ্রামের কাঁচা মেঠোপথ, দুপাশে সবুজ ধানক্ষেত। রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে এই দুর্গম কাদা-মাটির পথ ধরেই প্রতিদিন দৌড়াতে শুরু করতো ১৪ বছরের এক কিশোরী। পরনে সাধারণ পোশাক, পায়ে হয়তো খুব দামি জুতোও ছিলো না; কিন্তু চোখে ছিলো ট্র্যাকে ঝড় তোলার অদম্য স্বপ্ন। সব বাধা আর দারিদ্র্যকে পেছনে ফেলে সেই মেয়েটিই আজ জাতীয় ট্র্যাকে দেশের নতুন দ্রুততম মানবী।

এ গল্প কিশোরগঞ্জের প্রত্যন্ত অঞ্চলের গতিমানবী মারিয়া আক্তার তাসফিয়ার। সদ্য সমাপ্ত জাতীয় শিশু-কিশোর ক্রীড়া প্রতিযোগিতা 'নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস'-এ ১০০ ও ২০০ মিটার স্প্রিন্টে জোড়া স্বর্ণপদক জিতে পুরো দেশকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে সে।

মেঠোপথ থেকে জাতীয় ট্র্যাকে

কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার কর্শাকড়িয়াইল ইউনিয়নের সেহড়া পূর্বপাড়া গ্রাম। দরিদ্র কৃষক হিরন মিয়ার ছয় সন্তানের মধ্যে সবচেয়ে ছোট মারিয়া। স্থানীয় আলহাজ ওয়াজেদুল ইসলাম খান উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির এই শিক্ষার্থী ছোটবেলা থেকেই অন্যরকম এক অদম্য জেদ বুকে পুষে রেখেছিলো। নুন আনতে পান্তা ফুরানো সংসার, তার ওপর গ্রামীণ সমাজের নানা চোখরাঙানি ও প্রতিবন্ধকতা। কিন্তু কোনো কিছুই থামাতে পারেনি মারিয়ার দৌড়।

প্রতিদিন গ্রামের দুর্গম মেঠোপথ পেরিয়ে জেলা স্টেডিয়ামে এসে অনুশীলনে ঘাম ঝরাতো সে। সেই কঠোর পরিশ্রমের ফল মিলেছে জাতীয় মঞ্চে। ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’-এ ১০০ মিটার স্প্রিন্টে মাত্র ১৩ দশমিক ৭৫ সেকেন্ড এবং ২০০ মিটারে ২৮ দশমিক ৯৯ সেকেন্ড টাইমিং করে সবাইকে পেছনে ফেলে ফিনিশিং লাইন স্পর্শ করে সে।

দৌড় শেষে যখন স্টেডিয়ামজুড়ে উল্লাস, তখন বিজয়ের আনন্দে মারিয়া ছুটে যায় সরাসরি তার কারিগরের কাছে। স্নেহের সেই পরম স্পর্শ আর জোড়া সোনা গলায় ঝুলিয়ে মারিয়া প্রমাণ করেছে—স্বপ্ন দেখতে জানলে আর লড়াই করার মানসিকতা থাকলে দারিদ্র্য কখনোই বাধা হতে পারে না।

অশ্রুসজল চোখে বললেন মারিয়ার বাবা হিরন মিয়া বলেন, মেয়েটার হার না মানা জেদই আজ আমাদের এই আনন্দের মুখ দেখিয়েছে। অনটনের সংসারে একসময় অনুশীলন বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিলো, আজ পুরো দেশ ওকে নিয়ে কথা বলছে।

গ্রামের গর্ব, সহপাঠীদের অনুপ্রেরণা

মারিয়ার এই অর্জনে এখন আনন্দে ভাসছে সেহড়া পূর্বপাড়া গ্রাম। যে মেয়েটিকে খেলাধুলার কারণে একসময় নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হতো, আজ সে পুরো কিশোরগঞ্জ জেলার গর্ব। স্কুলের ছোট ছোট শিক্ষার্থীদের কাছে মারিয়া এখন এক রূপকথার নায়ক, স্বপ্নের অনুপ্রেরণা।

মারিয়াকে গড়ে তোলার পেছনের কারিগর কোচ আব্দুল জব্বার আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, এটি শেষ নয়, বরং কেবল শুরু। মারিয়ার ভেতরে যে প্রতিভা রয়েছে, তা অসাধারণ। সঠিক পুষ্টি, আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ আর দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা পেলে এই মেয়েই একদিন এশিয়ান গেমস কিংবা অলিম্পিকের ট্র্যাকে বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকা ওড়াবে।

দরকার শুধুই একটু সুযোগ ও পরিচর্যা

প্রতিভাবান এই অ্যাথলেটের পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দিয়েছে স্থানীয় জেলা ক্রীড়া দপ্তর। জেলা ক্রীড়া কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মারিয়ার জন্য ক্রীড়া বৃত্তি, আর্থিক সহায়তা এবং উন্নত প্রশিক্ষণের বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

তবে মারিয়ার গলায় জোড়া সোনা ঝুললেও কিশোরগঞ্জে এখনো অ্যাথলেটদের জন্য নেই পর্যাপ্ত আন্তর্জাতিক মানের অবকাঠামো। উপযুক্ত সুযোগের অভাবে প্রতি বছরই মারিয়ার মতো অসংখ্য সম্ভাবনা হয়তো অংকুরেই ঝরে যায়। তাই মারিয়ার এই জয় কেবল একটি উদযাপনের গল্প নয়, বরং নতুন প্রজন্মের ক্রীড়াবিদদের জন্য সুযোগ তৈরির এক জোর তাগিদ।

প্রত্যন্ত গ্রামের মেঠোপথ থেকে উঠে আসা এই গতিমানবী এখন অলিম্পিকের স্বপ্ন দেখছে। সঠিক সরকারি পরিচর্যা ও পৃষ্ঠপোষকতা পেলে মারিয়া আক্তার তাসফিয়া নামের এই ‘নতুন কুঁড়ি’ যে বিশ্বমঞ্চে ফুল হয়ে ফুটবে—সে বিশ্বাস আজ পুরো দেশবাসীর।