ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের সাভারের আমিনবাজারে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে প্রাণ হারানো পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) উপপরিদর্শক (এসআই) আলতাফ হোসেন হত্যা মামলায় আরও ৮ জনকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। ঘটনার পর মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে সাভার ও মুন্সীগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে এই আসামিদের আইনের আওতায় আনা হয়।
সোমবার সকালে রাজধানীর কারওয়ানবাজারে র্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত তুলে ধরেন র্যাব-১০-এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, আলতাফ হোসেন নিজেকে পুলিশের কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দেওয়ার পরও হামলাকারীরা ক্ষান্ত হয়নি; বরং আরও বেপরোয়া হয়ে তাকে পিটিয়ে হত্যা করে।
ডিআইজি মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান জানান, র্যাবের তথ্যমতে, গত ৫ সেপ্টেম্বর রাতে আমিনবাজারের বরদেশী এলাকায় একটি অটোরিকশা রাখা নিয়ে এক গ্যারেজ মালিকের ওপর চড়াও হয় একটি প্রাইভেটকারের চালক ও তার সহযোগীরা। তারা বেধড়ক মারধর করতে থাকলে পথচারী হিসেবে সেখানে উপস্থিত থাকা এসআই আলতাফ হোসেন ও তার ছেলে আরিফুল অন্যায়ের তীব্র প্রতিবাদ জানান।
প্রতিবাদ করার পরপরই হামলাকারীদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। এক পর্যায়ে পরিস্থিতি মারাত্মক রূপ নিলে এসআই আলতাফ নিজেকে পুলিশের বিশেষ শাখার সদস্য হিসেবে পরিচয় দেন। কিন্তু এতেও হামলাকারীরা থামেনি, উল্টো আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। প্রাণভয়ে এসআই আলতাফ হোসেন দৌড়ে গিয়ে পাশে থাকা তার ছেলের পোশাক কারখানায় আশ্রয় নেন। কিন্তু সেখান থেকেও নিস্তার মেলেনি। অভিযুক্তরা আরও ১৫ থেকে ২০ জন সহযোগীকে ডেকে এনে লাঠিসোটা ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ধাওয়া করে। একপর্যায়ে তারা কারখানার লোহার গেট ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়ে।
কারখানার ভেতরে ঢুকে হামলাকারীরা এসআই আলতাফ ও তার ছেলে আরিফুলকে এলোপাতাড়ি মারধর করতে থাকে। লোহার রড ও লাঠির নির্মম আঘাতে আশঙ্কাজনক অবস্থায় বাবা-ছেলেকে উদ্ধার করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের তাৎক্ষণিকভাবে ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক এসআই আলতাফ হোসেনকে মৃত ঘোষণা করেন। তার ছেলেও গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
ডিআইজি মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, এসআই আলতাফ হোসেনকে পুলিশ সদস্য হিসেবে টার্গেট করে হত্যা করা হয়নি। ঘটনার সময় অভিযুক্তরা নেশাগ্রস্ত ছিল। একটি অপরাধের ঘটনায় বাধা দিতে গিয়ে ঘটনাচক্রে হামলার শিকার হন ওই পুলিশ কর্মকর্তা। গ্রেপ্তার আপন এই হত্যাকাণ্ডের মূলহোতা। সে এসএস পাইপ দিয়ে এসআই আলতাফ হোসেনকে আঘাত করে।
মানবিক বিবেচনায় স্থানীয় ঝামেলা মীমাংসা করতে গিয়েছিলেন এসআই আলতাফ। কিন্তু হামলাকারীরা তার কোনো কথাই শোনেনি। একপর্যায়ে তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় জনসম্মুখে অপরাধ সংঘটিত হলেও অনেকেই অপরাধীকে পুলিশের হাতে তুলে না দিয়ে ছবি তুলে ঘটনাস্থল থেকে সরে যান বলে মন্তব্য করেন র্যাব-১০-এর অধিনায়ক।
তিনি বলেন, এ ধরনের সংগঠিত অপরাধে জনসাধারণকে এগিয়ে আসতে হবে। এগুলো নিয়ন্ত্রণ করা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষে একা সম্ভব নয়। জনসাধারণের সম্মিলিত প্রচেষ্টা থাকলে অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা সম্ভব এবং সম্মিলিত প্রতিরোধ হলে এই ধরনের অপরাধও কমে আসবে।
তিনি আরও বলেন, জনসম্মুখে কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে সাধারণ মানুষের দায়িত্ব হলো অপরাধীকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়া। এ ধরনের ঘটনায় আইনেও সাধারণ মানুষকে অপরাধীকে ধরে পুলিশের কাছে সোপর্দ করার বিধান রয়েছে। কিন্তু মানুষ বিবেক বিসর্জন দিয়ে শুধু ছবি তুলে ঘটনাস্থল এড়িয়ে যাচ্ছে, যা মানবিক স্খলনের উদাহরণ।
ঘটনার পর নিহত কর্মকর্তার পরিবারের পক্ষ থেকে ১৫ জনের নাম উল্লেখ করে সাভার থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। মামলা দায়েরের পরপরই গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করে র্যাব। গত ৬ সেপ্টেম্বর রাতে মুন্সীগঞ্জ সদর থানার লঞ্চঘাট এলাকা থেকে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে ৪ আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তীতে আমিনবাজার এলাকা থেকে আলাদা অভিযানে আরও চার আসামিকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। র্যাবের পক্ষ থেকে জানানো হয়, এজাহারভুক্ত অন্য পলাতক আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তারে একাধিক দল মাঠে কাজ করছে এবং আইনি প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা হচ্ছে।