২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর বঙ্গোপসাগরের উপকূলে আঘাত হাতে সুপার সাইক্লোন সিডর। আজ থেকে ১৭ বছর আগে এই দিনে মুহূর্তেই লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় সাগর পাড়ের কয়েকটি জেলার জনপদ ও বহু মানুষের জীবন। তবে সিডরে সবচেয়ে বেশি আঘাত হানে সুন্দরবন উপকূলীয় বাগেরহাটের শরণখোলায়। সেদিন বুক চিতিয়ে লড়েছিল সুন্দরবন। আঘাতের সময় সিডরের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ২৬০ কিলোমিটার। তবে এ সময় দমকা হাওয়ার বেগ উঠছিল ঘণ্টায় ৩০৫ কিলোমিটার পর্যন্ত। সিডরের প্রভাবে উপকূলে ১৫ থেকে ২০ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসের সৃষ্টি হয়। এসময় নিমেষেই তছনছ হয়ে যায় বলেশ্বর নদ তীরবর্তী ২০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ।
বাংলাদেশে সিডরের আগে যে ভয়ানক ঘূর্ণিঝড়গুলো আঘাত করেছিল, সেগুলোর কোনো নাম ছিল না। এর আগের বড় ঘূর্ণিঝড়গুলোকে ‘সিভিয়ার সাইক্লোনিক স্টর্ম’ বা প্রবল ঘূর্ণিঝড় হিসেবে উল্লেখ করা হতো। এ অঞ্চলে যে ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানবে, তার নাম দেওয়া হয় ২০০৪ সালে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা শ্রীলঙ্কার দেওয়া নাম অনুসারে সিডরের নামটি ঠিক করে, যার অর্থ চোখ।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলা ছিল বাগেরহাটের শরণখোলা। আর শরণখোলার মধ্যে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাউথখালী ইউনিয়ন।
সিডর আক্রান্ত এলাকায় জায়গার অভাবে গণকবর দিতে হয়। অনেক লাশের কোনো পরিচয়ও পাওয়া যায়নি। কাপড়ের অভাবে অনেক মরদেহ পলিথিনে মুড়িয়ে দাফন করা হয়। ঘটনার এক মাস পরেও ধানখেত, নদীর চর, বেড়িবাঁধ, গাছের গোড়া আর জঙ্গলের নানা আনাচকানাচ থেকে লাশ, লাশের অংশবিশেষ অথবা কঙ্কাল উদ্ধার হয়।
সিডরে সাউথখালী ও রায়েন্দা ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামের সহাস্রাধিক মানুষের নির্মম মৃত্যু হয়। এছাড়া মারা পড়ে ১২ হাজার গবাদি পশু। গৃহহীন হয় আট হাজার পরিবার। পরে শরণখোলার মানুষকে সুরক্ষা দিতে সরকার বিশ্বব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় বাগেরহাটের শরণখোলা-মোরেলগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের ৩৫/১ পোল্ডারে ৬২ কিলোমিটার এলাকায় বেড়িবাঁধ নির্মাণ করে। কিন্তু ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে বাঁধ নির্মাণ কাজ হস্তান্তরের পরপরই এর অন্তত ১৫টি পয়েন্টে দেখা দেয় ভয়ঙ্কর ভাঙন ও ব্লক ধ্বস।
নব নির্মিত বাঁধ ভেঙে এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন বলেশ্বর নদ তীরবর্তী হাজারও মানুষ। এ ঘটনায় স্থানীয়রা বিশ্বব্যাংকের বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পে নদী শাসনের ব্যবস্থা না রাখা এবং ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি, অনিয়মকে দায়ি করেছেন। পাশাপাশি দ্রুত নদী শাসন করে বাঁধ রক্ষা ও দায়িদের বিচারের দাবি জানিয়েছেন।
বাগেরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) একটি সূত্র জানায়, মোরেলগঞ্জ- শরণখোলায় পাউবোর ৩৫/১ পোল্ডারের সিআইপি বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা। চায়নার সিএইচডব্লিউ নামের ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান বাঁধ নির্মাণের দায়িত্ব পায়। ২০১৬ সালের জুনে নির্মাণ শুরু হয়। ২০১৯ সালে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বিভিন্ন অজুহাতে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে কাজ শেষ করা হয়। কিন্তু বাঁধটি হস্তান্তরের পরপরই অন্তত ১০টি পয়েন্টে ভাঙন ও ব্লক ধ্বস দেখা দেয়। ইতিমধ্যে বলেশ্বর তীরবর্তী গাবতলা, রায়েন্দা ও রাজৈর অংশে বাঁধের প্রায় তিন কিলোমিটার ঢালের ব্লক ধ্বসে গেছে।
উপজেলার ভাঙন কবলিত দক্ষিণ সাউথখালী গ্রামের বাসিন্দা ইউসুব হাওলাদার, রুহুল আমীন খোন্দকার, মিজানুর রহমান হাওরাদার জানান, সিডরের আঘাতে তাদের গ্রাম থেকে চার শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছিলো। তখন থেকেই তাদের দাবি ছিলো একটি টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের। শত শত কোটি টাকা খরচ করে বাঁধ করা হয়েছে ঠিক, কিন্তু টেকসই হয়নি। এমন বাঁধ তারা চাননি।
তাদের অভিযোগ, নির্মাণ কাজ শেষ হতে না হতেই ব্লক নদী গর্ভে বিলীন হচ্ছে। এতে আগামী ছয় মাসের মধ্যে লোকালয় প্লাবিত হতে পারে। তাই দ্রুত সংস্কার করা হোক।
বিএনপির শরণখোলা উপজেলা আহবায়ক কমিটির সচিব ও সাউথখালী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন পঞ্চায়েত জানান, চায়না ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান নির্মাণ কাজে চরম দুর্নীতি করেছে। মাটির বদলে নদী থেকে ড্রেজার দিয়ে বালু তুলে বাঁধ উঁচু করেছে। এখন সাধারণ ঝড় বন্যায় বাঁধ ধ্বসে পড়ছে। বিষয়টি বর্তমান সরকারের তদন্ত করে দ্রুত নদী শাসন করে বাঁধ রক্ষা করা হোক।
এ ব্যাপারে শরণখোলা উপজেলা নির্বাহী অফিসার সুদীপ্ত কুমার সিংহ জানান, বিষয়টি পানি উন্নয়ন বোর্ডকে জানিয়েছি। তারা বাঁধ রেকি করে গেছেন। ইতিমধ্যে বাঁধের ৩৫টি গর্ত মেরামত করা হয়েছে।
বাগেরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু রায়হান মোহাম্মদ আল বিরুনী জানান, সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে কর্তৃপক্ষকে জানাবো।
সিডরে কমপক্ষে ৩,৪৪৭ জন মানুষ মারা যায়। তবে কিছু ধারণা অনুযায়ী এই সংখ্যা ১৫ হাজারে পৌঁছেছে। বাংলাদেশ সরকার এ ঘটনাকে জাতীয় দুর্যোগ বলে ঘোষণা করেছে। এ ঘূর্ণিঝড়ে ৮.৯ মিলিয়ন হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে।