স্মৃতিতে এখনও দগদগে ২০২০ সালের সেই প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ‘আম্ফান’। মাত্র ১৫ মিনিটের জলোচ্ছ্বাসে লণ্ডভণ্ড হয়ে গিয়েছিলো সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর ইউনিয়ন। সেই ঝড়ে বিলীন হওয়া গড়ইমহল সড়কটি ছয় বছরেও ফিরে পায়নি তার পুরনো রূপ। পিচঢালা পথের জায়গায় এখন ঠাঁই পেয়েছে জীর্ণ এক বাঁশের সাঁকো। আর এই সাঁকোটিই এখন সাত গ্রামের কয়েক হাজার মানুষের চলাচলের একমাত্র ভরসা, যা প্রতিনিয়ত ডেকে আনছে বড়ো ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি।
গড়ইমহল গ্রামের বাসিন্দা রানুফা খাতুন সেই বিভীষিকাময় দিনের কথা মনে করে শিউরে ওঠেন। তিনি বলেন, আম্ফানের সময় মাত্র ১৫ মিনিটে আমাদের ৭৬ শতক ভিটাবাড়ি নদীতে বিলীন হয়ে যায়। ১১ মাস সাইক্লোন সেন্টারে আশ্রয় নিয়েছিলাম। এখন সবচেয়ে বড়ো চিন্তা সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে। ভালো রাস্তা না থাকায় তারা ঠিকমতো স্কুল-কলেজে যেতে পারছে না। বর্ষায় এই সাঁকো টিকবে কি না জানি না। আমরা নিরাপদ রাস্তা চাই।
রানুফার মতো একই হাহাকার ওই এলাকার হাজারো মানুষের। কুড়িকাহুনিয়া, সনাতনকাঠি, নাকনা, গোকুলনগর, গোয়ালকাটি ও শ্রীপুরসহ সাতটি গ্রামের মানুষের প্রধান যোগাযোগপথ এটি। দীর্ঘ পাঁচ বছর নৌকা পারাপার করার পর সম্প্রতি গ্রামবাসী ও ইউনিয়ন পরিষদের উদ্যোগে নির্মিত হয়েছে এই অস্থায়ী ভাসমান বাঁশের সাঁকো।
সড়কটি বিচ্ছিন্ন হওয়ায় পুরো এলাকার শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যবস্থা স্থবির হয়ে পড়েছে। নাকনা গ্রামের বাসিন্দা ডা. নিহার সরকার জানান, প্রতাপনগর ইউনিয়ন পরিষদ, ইউনাইটেড একাডেমি হাই স্কুল, এপিএস ডিগ্রি কলেজ, ফাজিল ও মহিলা মাদ্রাসাসহ গুরুত্বপূর্ণ বাজারগুলোতে যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম এই সড়ক।
শিক্ষার্থীরা জানায়, সাঁকো পার হতে গিয়ে অনেকেই নিচে পড়ে আহত হয়েছে। বিশেষ করে বর্ষাকালে সাঁকো পিচ্ছিল হয়ে গেলে শিশু ও বৃদ্ধদের যাতায়াত অসম্ভব হয়ে পড়ে। অসুস্থ মানুষকে হাসপাতালে নেওয়ার জন্য কোনো যানবাহন গ্রামে ঢুকতে পারে না।
গ্রামবাসী খালেক গাজী ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ছয় বছর ধরে শুধু আশ্বাসই পাচ্ছি। দুর্যোগ হলে পরিবার নিয়ে বের হওয়ারও কোনো পথ থাকবে না।
প্রতাপনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু দাউদ ঢালীর মতে, কুড়িকাহুনিয়ার কাঁঠালতলা থেকে মকবুল দোকানদারের বাড়ি পর্যন্ত প্রায় ৭০০ ফুট রাস্তা বিলীন হয়েছে। কার্পেটিং রাস্তা নির্মাণের জন্য প্রকল্প প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, কিন্তু কাজ এখনও শুরু হয়নি।
অন্যদিকে, আশাশুনি উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. আমিরুল ইসলাম সীমাবদ্ধতার কথা জানিয়ে বলেন, ঘূর্ণিঝড়ে রাস্তা ধুয়ে গিয়ে সেখানে গভীর খাদ তৈরি হয়েছে। এলজিইডির বাজেট স্বল্পতার কারণে স্থায়ী কাজ করা সম্ভব হয়নি। পরে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তিন লাখ ৯৪ হাজার টাকা ব্যয়ে ৭০০ ফুটের এই অস্থায়ী সাঁকোটি করা হয়। তবে স্থায়ী সমাধানের জন্য বড়ো অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ ও প্রচুর মাটি ভরাট প্রয়োজন।
এদিকে আশ্বাস আর বরাদ্দের মারপ্যাঁচে আটকে আছে সাত গ্রামের মানুষের ভাগ্য। প্রতিদিন কয়েক হাজার মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ওই বাঁশের সাঁকো পার হচ্ছেন। স্থানীয়দের দাবি, আর কোনো অস্থায়ী জোড়াতালি নয়, বরং দ্রুত স্থায়ী সড়ক পুনর্নির্মাণ করে তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পথ সুগম করা হোক।