নেত্রকোনা পৌরসভার পারলা গ্রাম। রাস্তার কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট আধাপাকা দালানটি পথচারীদের দৃষ্টি কাড়ে সহজেই। প্রথম দর্শনে মনে হবে, ছোট হলেও এক সুখী ও স্বচ্ছল পরিবারের নিবাস এটি। তবে ইটের এই পাকা দেয়ালের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে ক্ষুধা, অনিশ্চয়তা ও চরম মানবিক বিপর্যয়ের এক করুণ গল্প। চারজন বিধবা নারী, ৯০ বছর বয়সী শয্যাশায়ী এক বৃদ্ধা এবং তিন এতিম শিশুকে নিয়ে এই পরিবারের প্রতিটি দিন কাটছে অনাহারে ও অর্ধানাহারে। এক প্রবাসীর ভালোবেসে তৈরি করে দেওয়া সেই আধাপাকা ঘরটিই এখন তাদের জীবনধারণ ও সহায়তা পাওয়ার পথে প্রধান প্রতিবন্ধকতা বা ‘গলার কাঁটা’ হয়ে উঠেছে।
পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্য ৬০ বছর বয়সী জুলেহা বেগম। প্রায় ১২ বছর আগে স্বামী রেজ্জাক মিয়াকে হারিয়েছিলেন তিনি। একমাত্র ছেলে জলিল মিয়া কোনো মতে টেনে নিয়ে চলছিলেন সংসারের জোয়াল। কিন্তু কয়েক বছর আগে লিভারের জটিলতায় মারা যান জলিলও। পেছনে রেখে যান স্ত্রী ও দুই সন্তানকে। একই সময়ে ক্যানসারে স্বামী হারানো জুলেহার এক মেয়েও তার এতিম সন্তানসহ আশ্রয় নেন মায়ের ঘরে। সেই সঙ্গে যোগ হয়েছেন ৯০ বছর বয়সী শয্যাশায়ী শাশুড়ি সুবেরেন্নেসা। বর্তমানে সাত সদস্যের এই পরিবারে উপার্জন করার মতো কোনো পুরুষ নেই।
আগে তাদের ছনের তৈরি জরাজীর্ণ একটি ঘর ছিলো। জলিল মিয়ার মৃত্যুর পর তার এক প্রবাসী বন্ধু পরিবারটির জরাজীর্ণ দশা দেখে নিজ খরচে একটি আধাপাকা ঘর তুলে দেন। তবে ঘরের চেহারা বদলালেও বদলায়নি তাদের ভাগ্য। উল্টো এই ঘর দেখে স্থানীয়রা ও জনপ্রতিনিধিরা মনে করেন তারা সচ্ছল। ফলে কোনো ধরনের সরকারি বা সামাজিক সাহায্য মেলে না তাদের কপালে।
কান্নাভেজা কণ্ঠে জুলেহা বলেন, আমার পুত মরার পর বউ, ছেরি আর শাশুড়ি—সবাই অহন আমার ওপর। ছালা ঘর দেইখা পুতের বন্ধু এই ঘরডা কইরা দিছিল। অহন এই ইটের ঘর দেইখা সবাই মনে করে আমরা ধনী। বাবা, আমার ঘরে ভাত নাই! দুইবেলা নাতি-পুতি লইয়া ঠিকমতো খাইতে পারি না, ইডা কেউ বিশ্বাস করতে চায় না।
এই বয়সেও জুলেহাকে দুই-তিন বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করতে হয়। সেখান থেকে পাওয়া সামান্য চাল-ডাল দিয়েই কোনো মতে হাঁড়ি চড়ে তাদের। তবে খাদ্যসংকট ছাপিয়ে ৯০ বছরের বৃদ্ধার ওষুধের খরচ, তিন শিশুর পড়াশোনা ও চিকিৎসা এখন পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার উপক্রম।
অসুস্থতার কারণে বাইরে কাজে বের হতে পারেন না জলিল মিয়ার বিধবা স্ত্রী। কোলে দুই ছোট সন্তান আর বিছানায় অসুস্থ দাদি-শাশুড়িকে আগলে রেখে তার আকুল আবেদন, সরকার বা সমাজের মানুষেরা যদি আমাগো একটু কাজের ব্যবস্থা বা সাহায্য করত, তবে বাচ্চা দুটোকে মানুষ করতে পারতাম। তা না হলে চারজন বিধবা ও এতিম শিশুদের নিয়ে মরণ ছাড়া আমাদের আর কোনো পথ নেই।
বাইরের দালানের দেয়াল দেখে সিদ্ধান্ত না নিয়ে, ভেতরের নিদারুণ সত্যকে অনুবাধন করে পরিবারটির পাশে দাঁড়াতে সমাজের বিত্তবান ও স্থানীয় প্রশাসনের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন পারলা গ্রামের বাসিন্দারা।