একসময় বর্ষা এলেই নেত্রকোনার বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে দেখা যেতো পাটের সবুজ সমারোহ। খেত থেকে পাট কাটা, পানিতে জাগ দেওয়া, আঁশ ছাড়ানো আর রোদে শুকিয়ে হাটে বিক্রি করাকে কেন্দ্র করে জমে উঠতো গ্রামীণ অর্থনীতি। নদীপথে নৌকা বোঝাই করে জেলার পাট পৌঁছে যেতো দেশের বড়ো বড়ো মোকামে। নদীকেন্দ্রিক সেই ঐতিহ্য আর বাণিজ্যের স্মৃতি বহন করে আজ অব্দি টিকে আছে জেলার নদী ‘পাটেশ্বরী’। তবে সময়ের আবর্তে সেই সোনালি চিত্র এখন ফিকে হতে বসেছে। উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, জাগ দেওয়ার পানি সঙ্কট ও বাজারে নায্য দাম না পাওয়ায় নেত্রকোনায় মুখ থুবড়ে পড়েছে পাটের আবাদ।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে নেত্রকোনায় চার হাজার ৫১০ হেক্টর জমিতে পাট চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিলো। কিন্তু আবাদ হয়েছে মাত্র দুই হাজার ৮৪০ হেক্টর জমিতে। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে এক হাজার ৬৭০ হেক্টর জমিতে আবাদ কম হয়েছে। এর আগের বছরও একই লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আবাদ হয়েছিল চার হাজার ৪১০ হেক্টর জমিতে। সে হিসাবে মাত্র এক বছরের ব্যবধানে জেলায় পাটের আবাদ কমেছে এক হাজার ৫৭০ হেক্টর, যা শতকরা হিসাবে প্রায় ৩৬ শতাংশ কম। বলা যায়, জেলা পাটের চাষ শুধুই নামকাওয়াস্তে।
স্থানীয় কৃষক জানান, পাট চাষে জমি প্রস্তুত করা থেকে শুরু করে আঁশ ছাড়ানো পর্যন্ত প্রতিনিয়ত শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। কিন্তু বর্তমানে শ্রমিকের মজুরি অনেক বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচও অনেক বেড়ে গেছে। তার ওপর পাট পচানো বা জাগ দেওয়ার জন্য নদী-নালা ও জলাশয়ে পর্যাপ্ত পানি মিলছে না। বাধ্য হয়ে দূর-দূরান্তে নিয়ে পাট পচাতে হচ্ছে। এতো ঝক্কিঝামেলা ও খরচ সামলে বাজারে গিয়ে কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় চরম লোকসানে পড়তে হচ্ছে। ফলে কৃষক বাধ্য হয়ে পাট ছেড়ে একই জমিতে সবজি, সরিষাসহ কম পরিশ্রমে অধিক লাভজনক ফসলের দিকে ঝুঁকছেন।
এদিকে প্রণোদনা দিয়েও পাটের পতন ঠেকানো যাচ্ছে না বলে জানা গেছে। চলতি বছর জেলার ৮০০ কৃষককে বিনামূল্যে এক কেজি করে পাটবীজ এবং পাঁচ কেজি করে ডিএপি ও এমওপি সার দেওয়া হয়েছে। এর আগের বছরও চার হাজার কৃষক প্রণোদনা পেয়েছিলেন। তবে সুনির্দিষ্ট বাজারমূল্য ও মুনাফা নিশ্চিত না হওয়ায় কেবল বীজ-সারের প্রণোদনা দিয়ে কৃষকদের পাটে ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
পরিবেশকর্মীদের মতে, বাজারে প্লাস্টিকের অবাধ ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়া এবং সাশ্রয়ী পাটজাত পণ্যের বাজার তৈরির পর্যাপ্ত উদ্যোগ না থাকায় পাটের চাহিদা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। জেলা পরিবেশকর্মী অহিদুর রহমান জানান, প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে পাটের ব্যাগ ও বস্তার ব্যবহার বাধ্যতামূলক ও সহজলভ্য করা গেলে পরিবেশের সুরক্ষার পাশাপাশি কৃষকরাও আবারও পাট চাষে উৎসাহিত হতেন।
এ বিষয়ে নেত্রকোনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আমিরুল ইসলাম বলেন, কৃষক এখন একই জমিতে স্বল্প সময়ে তুলনামূলক বেশি লাভজনক সবজি, সরিষাসহ অন্য ফসল চাষ করছেন। কৃষকের ফসল নির্বাচনের এই পরিবর্তনের কারণেই প্রধানত পাটের আবাদি জমি কমে যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, কেবল আবেগে নয়, লাভের হিসাব মিলেই কৃষক আবার মাঠে ফিরবেন। তাই পাটের সোনালি দিন ফেরাতে হলে কৃষকের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিতকরণ, পচনের আধুনিক সুযোগ-সুবিধা তৈরি, উন্নত জাতের বীজ সরবরাহ এবং পাটজাত পণ্যের অভ্যন্তরীণ বাজার সম্প্রসারণ করা জরুরি। অন্যথায় ‘পাটেশ্বরী’ নদীর মতো পাটের সমৃদ্ধ ইতিহাসও একদিন কেবল স্মৃতি হয়ে থাকবে।