একটি নতুন চাকরির স্বপ্ন, বুকভরা আনন্দ আর প্রিয়জনদের কাছে ফেরার তীব্র আকুলতা- সবকিছুই মুহূর্তের মধ্যে ধূলিসাৎ হয়ে গেল এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায়। নতুন কর্মস্থলে যোগ দিয়ে পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে বাড়ি ফিরছিলেন ৩০ বছর বয়সী তরুণ আনোয়ার হোসেন।
কিন্তু মরণঘাতী মহাসড়ক তাঁকে আর পরিবারের কাছে পৌঁছাতে দিল না। পথেই নিভে গেল একটি তাজা প্রাণ, থমকে গেল একটি উদীয়মান সংসারের সব আশা-আকাঙ্ক্ষা।
মঙ্গলবার ভোরে নাটোর-পাবনা মহাসড়কের বনপাড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের সামনে বাসের সাথে ট্রাকের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে আনোয়ার হোসেনসহ প্রাণ হারান ১৪ জন। ভয়াবহ এই দুর্ঘটনায় আরও অন্তত ২৫ জন গুরুতর আহত হন।
নিহত আনোয়ার হোসেন রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার শ্রীপুর ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী চাঁইপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আনোয়ার সম্প্রতি আরও উন্নত একটি প্রকল্পে নতুন চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন।
নতুন কাজের আনন্দ ভাগাভাগি করতে এবং স্বজনদের দেখা পেতে তিনি বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হন। কথা ছিল নাটোর-রাজশাহী মহাসড়কের পুঠিয়ায় বাস থেকে নেমে সোজা ভিটায় ফিরবেন। মুঠোফোনে হাসিমুখে স্বজনদের জানিয়েওছিলেন- ‘আমি বাড়ি ফিরছি’। কিন্তু সেই ফেরা যে শেষ ফেরা হবে, তা ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেননি কেউ।
আনোয়ারের এমন করুণ ও অকাল মৃত্যুর খবর গ্রামে পৌঁছাতেই পুরো চাঁইপাড়া জুড়ে নেমে আসে এক নিস্তব্ধ ও হৃদয়বিদারক শোকের ছায়া। স্বামী হারানোর খবর যখন পান, তখন তাঁর স্ত্রী ফাতেমা বিবি দুই নিষ্পাপ সন্তানকে নিয়ে বাবার বাড়ি কনোপাড়ায় ছিলেন।
খবর পাওয়া মাত্রই সন্তানদের বুকে জড়িয়ে ধরে স্বামীর ভিটায় ছুটে আসেন তিনি। বারবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলা ফাতেমার আর্তনাদে ভারী হয়ে ওঠে চারপাশের বাতাস। অনাগত ভবিষ্যতে দুই এতিম সন্তানকে নিয়ে তিনি কীভাবে বাঁচবেন, সেই দিশাহীন প্রশ্ন এখন সহমর্মী প্রতিবেশীদের চোখেও জল এনে দিচ্ছে।
বাগমারা থানার ওসি তৌহিদুল ইসলাম গভীর সমবেদনা প্রকাশ করে জানান, আইনি প্রক্রিয়া ও আনুষ্ঠানিকতা শেষে বনপাড়া হাইওয়ে পুলিশের সহায়তায় মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তরের ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।
উদ্ধারকর্মীরা জানান, বরিশাল থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জগামী আরপি পরিবহনের বাসটির সাথে বিপরীতমুখী একটি ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ হলে ঘটনাস্থলেই তৈরি হয় এক নারকীয় দৃশ্য। মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনা কেবল আনোয়ারের জীবনই কেড়ে নেয়নি, চিরতরে স্তব্ধ করে দিয়েছে একটি সাধারণ পরিবারের রঙিন ভবিষ্যৎ।