ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলায় স্বর্ণের কলসি ও পুতুল পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে নাসিমা আক্তার (৩৬) নামে এক গৃহবধূকে শ্বাসরোধে হত্যা করেছেন স্থানীয় এক কথিত তান্ত্রিক (কবিরাজ)। জনমানবহীন স্থান থেকে উদ্ধার হওয়া ওই নারীর অর্ধপোড়া মরদেহের সূত্র ধরে মাত্র ২০ ঘণ্টার মধ্যে এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করেছে জেলা পুলিশ।
মঙ্গলবার (২ জুন) রাত সাড়ে আটটায় ঠাকুরগাঁও পুলিশ সুপার কার্যালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে এসব তথ্য জানান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ খোদাদাদ হোসেন।
এর আগে সোমবার (১ জুন) সকালে হরিপুরের ভাতুড়িয়া এলাকার একটি নির্জন স্থান থেকে নাসিমার অর্ধপোড়া মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহত নাসিমা আক্তার স্থানীয় বাসিন্দা ছিলেন।
সাংবাদিক সম্মেলনে জানানো হয়, প্রায় ক্লুলেস অবস্থায় পুলিশ সুপার মো. বেলাল হোসেনের নির্দেশনায় তদন্তে নামে জেলা পুলিশ। তদন্তের শুরুতেই নিহতের ১২ বছর বয়সী মেয়ের দেওয়া তথ্য, পূর্বের অর্থ লেনদেনের হিসাব এবং প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের মূল সূত্র খুঁজে পায় পুলিশ।
হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সোমবারই অভিযুক্ত কবিরাজ মো. সামশুল হককে (৫৫) গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি হরিপুর উপজেলার টেঙরিয়া মকবুল পাড়া গ্রামের মৃত মফিজ উদ্দিনের ছেলে। জিজ্ঞাসাবাদে সামশুল হত্যার দায় স্বীকার করেছেন এবং আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নাসিমার কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া ৩০ হাজার টাকা ও হত্যার বিভিন্ন আলামত উদ্ধার করে পুলিশ।
পুলিশের তদন্ত ও আসামির জবানবন্দির বরাতে জানা যায়, অভিযুক্ত সামশুল হক দীর্ঘদিন ধরে স্বর্ণ পাওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছিলেন। নাসিমাও তার কাছ থেকে স্বর্ণ পাওয়ার আশায় টাকা দিয়েছিলেন। ঘটনার দিন নাসিমা কবিরাজকে চাপ দিয়ে বলেন, সেদিন যেন তিনি স্বর্ণের কলসি বা স্বর্ণের পুতুল ছাড়া বাড়ি না ফেরেন। যেকোনো উপায়ে সেদিনই তাকে স্বর্ণ দিতে হবে।
এই চাপের মুখে কবিরাজ পূর্বপরিকল্পিতভাবে নাসিমাকে একটি নির্জন স্থানে নিয়ে যান। সেখানে তন্ত্র-মন্ত্রের আচার পালনের কথা বলে আচমকা নাসিমার গলায় দড়ি পেঁচিয়ে টান দেন। একপর্যায়ে শ্বাসরোধে ঘটনাস্থলেই নাসিমার মৃত্যু হয়।
হত্যাকাণ্ড ঘটানোর পর ঘটনাটি ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে ও আলামত নষ্টের উদ্দেশে নিষ্ঠুর পথ বেছে নেন ওই কবিরাজ। তিনি দিয়াশলাইয়ের কাঠি দিয়ে নাসিমার বোরখায় আগুন ধরিয়ে দিয়ে পালিয়ে যান। তবে আগুন পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়ার আগেই নিভে যায়। এই কারণে মরদেহের পেছনের অংশে দগ্ধ হওয়ার চিহ্ন এবং গলায় রশির দাগ পায় পুলিশ।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ খোদাদাদ হোসেন বলেন, মাত্র ২০ ঘণ্টার মধ্যে পুলিশ এই চাঞ্চল্যকর ও ক্লুলেস হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করতে সক্ষম হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে ওই সামসুলের বিরুদ্ধে এমন একাধিক প্রতারণার তথ্য পাওয়া গেছে। ঘটনার নেপথ্যে আরও কোনো তথ্য আছে কি না, তা উদঘাটনে পুলিশের তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।