ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্তে থাকা রাজধানীর সরকারি সাত কলেজ নিয়ে একটি স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এবছর থেকে যাত্রা শুরু করছে ঢাকার কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় (ডিসিইউ)। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে ১১ হাজার ১৫০ জন শিক্ষার্থী ভর্তির সুযোগ পাবেন। যা গতবারের তুলনায় কম।
রোববার (৩ আগস্ট) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনক্রমে ২০২৪-২০২৫ শিক্ষাবর্ষে প্রস্তাবিত ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি বা তার সমকক্ষ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আন্ডারগ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রামের (বিদ্যমান একাডেমিক কাঠামোতে) ভর্তি নির্দেশিকায় এ তথ্য জানানো হয়।
ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসক ও ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক এ কে এম ইলিয়াস স্বাক্ষরিত ওই নির্দেশিকায় বলা হয়, রাজধানীর সরকারি সাত কলেজে বিজ্ঞান, বাণিজ্য এবং কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান ইউনিটের অধীনে অনার্স প্রথম বর্ষে ভর্তির আবেদন শুরু হবে আজ রাত থেকেই। অনলাইনে আবেদন করা যাবে ১০ আগস্ট রাত ১১টা ৫৯ মিনিট পর্যন্ত।
আবেদন বাতিল ও তথ্য-ছবি সংশোধনের শেষ সময় নির্ধারিত হয়েছে ১২ আগস্ট। আগামী ১৭ আগস্ট থেকে প্রবেশপত্র ডাউনলোড শুরু এবং ২০ আগস্ট থেকে আসন বিন্যাস প্রকাশ করা হবে।
প্রতিবারের মতো এবারও ইডেন ও বদরুন্নেসায় শুধু ছাত্রী, আর ঢাকা কলেজে শুধু ছাত্র ভর্তির সুযোগ পাচ্ছে। বাকি চার কলেজে ছাত্রী–ছাত্র উভয়েই ভর্তি হতে পারবেন।
ইতিমধ্যে যারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত সাত কলেজে প্রাথমিক আবেদন করেছেন, তাদের পুনরায় আবেদন করতে হবে না; আগের আবেদনই ডিসিইউ আবেদন হিসেবে গণ্য হবে।
নির্দেশিকার তথ্যমতে, এবার কোটায় আসন পূরণ না হলে মেধা তালিকা থেকে আসন পূরণ করা হবে। একইভাবে কোনো বিষয়ে আসন পূরণ না হলে অন্য ইউনিট থেকে পূরণ করা যাবে।
এর আগে গত ২৪ জুলাই একাত্তরের সঙ্গে আলাপকালে অধ্যক্ষ অধ্যাপক এ কে এম ইলিয়াস একাত্তরকে জানিয়েছিলেন, কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষা হবে ২২ আগস্ট (শুক্রবার) বিকেল ৩টা থেকে ৪টা পর্যন্ত।
এছাড়া বিজ্ঞান ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষা হবে ২৩ আগস্ট (শনিবার) সকাল ১১টা থেকে ১২টা পর্যন্ত। বাণিজ্য ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষা হবে ওই একইদিন বিকেল ৩টা থেকে ৪টায়।
নির্দেশিকা অনুসারে কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান ইউনিটে ১০০ নম্বরের এমসিকিউ পরীক্ষায় বাংলা, ইংরেজি এবং সাধারণ জ্ঞান—এই তিন বিষয়ে মোট ১০০টি প্রশ্ন থাকবে। প্রতিটি ভুল উত্তরের জন্য ০.২৫ নম্বর কাটা হবে। পাস নম্বর নির্ধারিত হয়েছে ৪০। যারা বাংলা বা ইংরেজি বিষয়ে ভর্তি হতে চান, তাদের সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ন্যূনতম ১০ নম্বর পেতে হবে।
বিজ্ঞান ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ২০২৪ সালের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার পাঠ্যসূচি অনুসারে প্রণয়ন করা হবে। প্রত্যেক প্রার্থীকে পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নসহ মোট চারটি বিষয়ের প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। প্রতি বিষয়ে ২৫ নম্বর বরাদ্দ রয়েছে। মোট ১০০টি প্রশ্নের জন্য পূর্ণ নম্বর হবে ১০০। ভর্তি পরীক্ষায় পাসের জন্য ন্যূনতম ৪০ শতাংশ নম্বর অর্জন করতে হবে, অর্থাৎ ৪০ নম্বরের কম পেলে কেউ ভর্তির যোগ্য হবেন না।
বাণিজ্য বিভাগে মোট ১২০ নম্বরের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের মেধা তালিকা তৈরি করা হবে। এজন্য শিক্ষার্থীদের মাধ্যমিক পরীক্ষার (৪র্থ বিষয়সহ) প্রাপ্ত জিপিএ ১০ নম্বরে এবং উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় (৪র্থ বিষয়সহ) প্রাপ্ত জিপিএ ১০ নম্বর রূপান্তর করে এই দুইয়ের যোগফলসহ ১০০ নম্বরের ভর্তি পরীক্ষায় প্রাপ্ত নম্বরের সাথে যোগ করে মোট ১২০ নম্বরে ওপর শিক্ষার্থীদের মেধা তালিকা তৈরি করা হবে। ২০২৪ সালের উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে সিলেবাসের ভিত্তিতে প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করা হবে।
ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটিতে ভর্তির আবেদন ফি নির্ধারণ করা হয়েছে ৮০০ টাকা। এই ফি সোনালী, জনতা, রূপালী ও অগ্রণী ব্যাংকের যেকোনো শাখার মাধ্যমে অথবা ডেবিট-ক্রেডিট কার্ড, বিকাশ, নগদ এবং রকেটের মাধ্যমে পরিশোধ করা যাবে। পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষা শুরুর আধা ঘণ্টা আগে কেন্দ্রে উপস্থিত হতে হবে এবং প্রবেশপত্রের সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি সঙ্গে রাখতে হবে।
একইসঙ্গে কোটায় ভর্তি-ইচ্ছুকদের (মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, উপজাতি, প্রতিবন্ধী, হরিজন-দলিত, ক্রীড়াবিদ, ওয়ার্ড এবং হিজড়া) অবশ্যই ভর্তি পরীক্ষায় পাস নম্বর পেতে হবে এবং সাত দিনের মধ্যে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অফিসে প্রমাণপত্র জমা দিতে হবে বলেও জানানো হয়েছে।
ঢাকা সেন্ট্রাল বিশ্ববিদ্যালয়ের আছে রাজধানীর সাত সরকারি কলেজ। এগুলো হলো -ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ, সরকারি বাঙলা কলেজ কলেজ, কবি নজরুল সরকারি কলেজ, সরকারি তিতুমীর কলেজ ও সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ।
অধ্যাপক এ কে এম ইলিয়াস একাত্তরকে জানিয়েছেন, ঢাকা সেন্ট্রাল বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নতুন একটি ওয়েবসাইট করা হচ্ছে। ওয়েবসাইটটি দ্রুতই চালু হবে। এখন সাত কলেজের একটি ওয়েবসাইট, যা আগে ছিলো, সেটা চালু রয়েছে। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) নতুন ওয়েবসাইটের বিষয়ে কাজ করছে।
ভর্তি পরীক্ষার টেকনিক্যাল বিষয়ে বুয়েট সহযোগিতা করবে বলেও জানান তিনি।
গত ৯ জুলাই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সরকারি সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা থেকে ২০২৪-২০২৫ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি কার্যক্রম শুরু করার অনুমোদন দেওয়া হয়।
সিনিয়র সহকারী সচিব এ. এস. এম. কাশেমের সই করা স্মারকে তখন বলা হয়, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) ৭ জুলাইয়ের একটি স্মারকের আলোকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এতে জানানো হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত সাতটি সরকারি কলেজের শিক্ষার্থীদের ভর্তির ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি’ কাঠামোর আওতায় ভর্তি কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন উদ্যোগের ফলে ঢাকার সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের স্বতন্ত্র একাডেমিক কাঠামোতে ভর্তি ও শিক্ষা কার্যক্রম গতি পাবে।
এক সময় দেশের সব ডিগ্রি কলেজ পরিচালিত হতো ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে। ১৯৯২ সালে সরকারি কলেজগুলোকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ন্ত্রণ থেকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করা হয়।
২০১৪ সালের শেষ দিকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ২৭৯টি সরকারি কলেজকে বিভাগীয় পর্যায়ের পুরনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করার নির্দেশ দেন ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
এর ধারাবাহিতায় ঢাকার ঐতিহ্যবাহী সাত সরকারি কলেজকে ২০১৭ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে নেওয়া হয়। ক্ষমতার পালাবদলের পর শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে সাত সরকারি কলেজকে অধিভুক্তি থেকে মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
এর অংশ হিসেবে ২০২৪-২৫ সেশন, অর্থাৎ চলতি বছর থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সাত কলেজের শিক্ষার্থী ভর্তির কার্যক্রম বন্ধ করার কথা জানানো হয় গত ২৭ জানুয়ারি।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক এস এম এ ফায়েজ গত জানুয়ারিতে বলেছিলেন, সাত কলেজের জন্য পৃথক বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম হতে পারে ‘জুলাই ৩৬ বিশ্ববিদ্যালয়’। তবে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনার পর ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি’ নামটি চূড়ান্ত হয়।