বুয়েটের রাজনৈতিক ইতিহাস ও বর্তমান পরিস্থিতি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশেই বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বুয়েটের অনেক ছাত্র-শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং তাদের মধ্যে ২০ জন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে শহীদ হন। একই সাথে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাও করেন অনেক শিক্ষক-ছাত্র।

বুয়েটে মৌলবাদীদের আস্তানা গড়ে ওঠে একদম শুরু থেকেই। ভর্তি পরীক্ষা থেকেই শিক্ষার্থীদের মৌলবাদী আদর্শে দীক্ষা দেওয়া হয়। শিবিরের পরিচালনায় কনক্রীট, উদ্ভাস সহ বেশ কয়েকটি কোচিং সেন্টার আছে। শিবির কখনো প্রকাশ্য কখনো গোপনে সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচলনা করে। 

অবস্থা বেগতিক দেখলে তারা ছাত্রদলে আশ্রয় নেয়। বুয়েটে ২০০৩ সালে ছাত্রদলের দুই গ্রুপে সংঘর্ষে সাবিকুন নাহার সনি মারা যায়। সেই দু’গ্রুপের মধ্যে এক গ্রুপ ছিল শিবির নিয়ন্ত্রিত ছাত্রদল। বিএনপি ক্ষমতা হারালে শিবির আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে চলে যায়। তবে কার্যক্রম বন্ধ করেনি। এর প্রমাণ ২০১৩ সালে ছাত্রলীগ নেতা আরিফ রহমান দ্বীপ হত্যা।

বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি একাধিকবার বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে, এ সুযোগে বার বার মৌলবাদী রাজনীতি মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে ডাকসু, রাকসু, চাকসু, জাকসু, ঢামেকসু সহ সারাদেশের প্রায় সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ বিজয়ী হলেও একমাত্র বুয়েটের ইউকসুতে ছাত্রদল-ছাত্রশিবিরের জোট ভিপিসহ গুরুত্বপূর্ণ তিনটি পদে (সাতটির মধ্যে) জয় পায়।

তবে বুয়েটের ছাত্রসমাজ মৌলবাদীদের সবসময় প্রতিহত করেছে। যেমন- ১৯৯২ সালে বুয়েটের দ্বিতীয় সমাবর্তনে রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাসের আসার কথা ছিল। তবে শিক্ষার্থীদের প্রতিরোধের মুখে তিনি বুয়েটে আসতে ব্যর্থ হন, প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া সমাবর্তনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত হন।

২০১৩ সালের ৯ এপ্রিল বুয়েটের নজরুল ইসলাম হলে ছাত্রলীগের নেতা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের যন্ত্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী আরিফ রায়হান দীপকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে মৌলবাদীরা। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২০১৩ সালের ২ জুলাই হাসপাতালে মারা যান দীপ।

দীপের হত্যাকাণ্ডের বিচার না হওয়া বুয়েটে মৌলবাদীদের সাথে স্পষ্ট বিরোধ তৈরি হয়। তারই ধারাবাহিকতায় ভারতবিরোধী স্ট্যাটাসের জের ধরে আবরার ফাহাদকে নির্যাতন ও হত্যা করা হয়। নিষিদ্ধ করা হয় ছাত্র রাজনীতি।

১১ বছর পার হলেও দীপ হত্যাকারীদের শাস্তি হয়নি। মৌলবাদীরা প্রতিবছর বুয়েট থেকে পাস করে যাচ্ছেন, অনেকে শিক্ষকও হয়েছেন।

মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে যথাসময়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হলে বুয়েটে মৌলবাদী রাজনীতি মাথাচাড়া দিয়ে উঠতো না। বিরোধও এতো তুঙ্গে উঠতো না। হয়তো ফাহাদ হত্যাকাণ্ডও ঘটতো না।

২০১৯ থেকে বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ। অথচ ২০২২ সালে জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা ও দোয়া অনুষ্ঠান নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে একদল শিক্ষার্থী পণ্ড করে দেয়। 

বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি বন্ধ থাকার পরেও নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন হিজবুত তাহরীর ও যুদ্ধাপরাধী-মৌলবাদী সংগঠন শিবিরের তৎপরতা নিয়ে কথিত সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের কোন কথা নেই।

২০২৩ সালে সুনামগঞ্জের হাওরে আটক, নাশকতার মামলার আসামি ৩১ শিবিরকর্মীর বিচার বিষয়ে তথাকথিত সাধারণ শিক্ষার্থীদের কিছু কথা নেই।

বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করার মূল কারণ সাম্প্রদায়িক রাজনীতি পরিচালনা। বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ। অথচ বুয়েটে ছাত্রশিবিরের কমিটি রয়েছে। তারা সাংগঠনিক কার্যক্রমও পরিচালনা করছে। সেসব কর্মকাণ্ডের ছবি পাওয়া গেছে হাওরে আটক বুয়েট শিক্ষার্থীদের মোবাইলে।

বুয়েটে রাজনীতি বন্ধ, একই সাথে সাংস্কৃতিক তৎপরতাও স্থবির। শুধু চলছে সাম্প্রদায়িক কার্যক্রম। শিবির, হিজবুত তাহরির ও অন্যান্য সাম্প্রদায়িক সংগঠনগুলোর বেশিরভাগ কার্যক্রম মসজিদভিত্তিক হওয়ায় এসব কর্মকাণ্ড থেমে নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একটি অংশ সরাসরি তাদের মদদ দিচ্ছে।

যেখানে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ, সেখানে মসজিদভিত্তিক রাজনীতির সুবাদে শিবিরের ঘাঁটি গড়ে ওঠে এবং গলাকাটা, রগকাটার রাজনীতি শুরু হয়। বুয়েটেও এখন সেই আলামত দেখা যাচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কথা বললেও তাকে ‘আবরারের হত্যাকারী’ বা ‘ছাত্রলীগ’ বলে ট্যাগ দেওয়া হচ্ছে। সামাজিক মাধ্যমে হেয় করা হচ্ছে। মৌলবাদ বিরোধী মানববন্ধন করায় শিক্ষার্থীদেরকে সারারাত আটকে রেখে জবাবদিহি চাওয়া হয়।

বুয়েটে রাজনীতি নিষিদ্ধ হলে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হিযবুত তাহরীরের পোস্টারিং করছে কারা? নিষিদ্ধ এ সংগঠনটির মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরা সক্রিয় থেকে কর্মী সংগ্রহ ও প্রকাশ্যে লিফলেট বিতরণ করছে কী করে? ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করে প্রকৃতপক্ষে মৌলবাদ-জঙ্গিবাদের বিকাশ ঘটছে বুয়েটে।