বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির একটি ‘লার গিবন’ আদর করার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করে বড় ধরনের আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতায় পড়েছেন ভারতের দক্ষিণী চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় অভিনেতা বিক্রম। ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করা ভিডিওটি ঘিরে তুমুল বিতর্ক শুরু হওয়ার পর তামিলনাড়ুর বন বিভাগ ইতোমধ্যে বিষয়টি নিয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করেছে।
গত সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে একটি ভিডিও শেয়ার করেন বিক্রম, যেখানে তাঁকে একটি লার গিবনকে কোলে নিয়ে আদর করতে ও খেলা করতে দেখা যায়। ভিডিওটি প্রকাশ্যে আসতেই নেটদুনিয়ায় তোলপাড় সৃষ্টি হয় এবং তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তবে বিতর্কের মুখে পড়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ভিডিওটি নিজের অ্যাকাউন্ট থেকে মুছে ফেলেন অভিনেতা।
তামিলনাড়ুর বন বিভাগ তদন্ত করে দেখছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই বিরল বিপন্ন প্রাণীটি কীভাবে চেন্নাইয়ের একটি ব্যক্তিগত বাসভবনে এল এবং তা হস্তান্তরের ক্ষেত্রে নিয়মকানুন সঠিকভাবে মানা হয়েছিল কি না।
তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গিবনটি চেন্নাইতে বিক্রমের এক নিকটাত্মীয়ের বাড়িতে রাখা হয়েছিল। তবে বন বিভাগ এখনই নিশ্চিত করে বলছে না যে, প্রাণীটি পাচার করে আনা হয়েছে কিংবা বিক্রম নিজে এর অবৈধ মালিক। অভিনেতা বিক্রম বা তাঁর দল এখনো এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি, যদিও তাঁর জনসংযোগ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রয়োজন হলে পরবর্তীতে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়া হবে।
লার গিবন হলো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার থাইল্যান্ড, মিয়ানমার ও মালয়েশিয়ার ট্রপিক্যাল বনে বসবাসকারী ছোট আকারের এক বিশেষ প্রজাতির বানর জাতীয় প্রাণী। এদের মুখের চারপাশে সাদা লোমের একটি বলয় থাকে। আন্তর্জাতিক বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ চুক্তি 'সাইটিস'-এর অধীনে এই প্রজাতিটি চরম সংরক্ষিত এবং এদের ক্রয়-বিক্রয় অত্যন্ত কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত।
সামাজিক মাধ্যমের ওই সামান্য ভিডিওটি বন্যপ্রাণী কর্মকর্তাদের প্রায় ২,০০০ কিলোমিটার দূরে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মনিপুরে নিয়ে গেছে। তদন্তে জানা গেছে, ২০২০ সালে মনিপুরের এক ব্যক্তি সরকারি 'পরিবেশ' পোর্টালে মালয়েশিয়া থেকে আনা আটটি লার গিবনের তথ্য নিবন্ধন করেছিলেন।
নথি অনুযায়ী, চলতি বছরের ৫ জুন মনিপুর থেকে তিনটি গিবন তামিলনাড়ুর ইরোড জেলার পেরুন্দুরাইয়ের এক ব্যক্তির কাছে 'দত্তক' হিসেবে পাঠানো হয়। এরপর ৫ আগস্ট দুটি গিবন পেরুন্দুরাই থেকে চেন্নাইয়ে বিক্রমের আত্মীয়ের বাড়িতে আনা হয়। তবে এই স্থানান্তরের জন্য তামিলনাড়ুর চিফ ওয়াইল্ডলাইফ ওয়ার্ডেনের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় অনুমতি নেওয়া হয়েছিল কি না, তার কোনো বৈধ কাগজপত্র এখনো পাননি তদন্তকারীরা।
ভারতের ওয়াইল্ডলাইফ ক্রাইম কন্ট্রোল ব্যুরোও বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে নিয়ে চেন্নাই বন্যপ্রাণী কর্মকর্তাদের নথি যাচাইয়ের নির্দেশ দিয়েছে। মনিপুর ও মিয়ানমার সীমান্ত আন্তর্জাতিক বন্যপ্রাণী পাচারের অন্যতম রুট হিসেবে পরিচিত হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে পরিবেশবাদীদের মনেও নানা প্রশ্ন উঠছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংককসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে ভারতে বিদেশি প্রাণী ও বানরজাতীয় প্রাণী পাচারের প্রবণতা বেশ বেড়েছে। গত কয়েক মাসে মুম্বাই, বেঙ্গালুরু ও চেন্নাই বিমানবন্দরে একাধিকবার অবৈধ বিদেশি বন্যপ্রাণী জব্দ করা হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে একজন প্রথম সারির তারকার বাড়িতে এমন সংরক্ষিত প্রাণীর উপস্থিতি বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনের কঠোর প্রয়োগের ওপর পুনরায় আলো ফেলল।
তথ্যসূত্র: বিবিসি