স্বাধীনতা পদকের অন্যতম দাবিদার শিল্পী রথীন্দ্রনাথ রায়

রথীন্দ্রনাথ রায় নামটি বললে, আলাদা করে আর বিশেষণ দেয়ার প্রয়োজন পড়ে না। বাংলাদেশের সঙ্গীতে তার অবদান, দরাজ কণ্ঠ এবং বিশেষ ধরণের গায়কী সবসময়ের জন্য তাকে আলাদা করে রেখেছে; দিয়েছে কিংবদন্তীর মর্যাদা। 

ভাওয়াইয়া গানের অসাধারণ শিল্পী থেকে বাংলাদেশের গান-তাকে নিয়ে গেছে অন্য এক উচ্চতায়। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে অসামান্য অবদান রাখা এই শিল্পী নিজেকে একজন কণ্ঠযোদ্ধা হিসেবে পরিচয় দিতে ভালোবাসেন। তার সবসময়ের দাবি, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রকে দেয়া হোক মুক্তিযুদ্ধের একটি সেক্টরের মর্যাদা।

২৩ জানুয়ারি ছিল এই গুণী শিল্পীর ৭৩তম জন্মদিন। একাত্তর টিভিকে দেয়া বিশেষে সাক্ষাৎকারে রথীন্দ্রনাথ রায় বলেন, 'এগারোটি সেক্টরে ভাগ হয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধারা অদম্য সাহসে যুদ্ধ করেছেন। আর স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পীরা তাদেরকে প্রেরণা জুগিয়েছেন দেশ মাতৃকার জন্য গান গেয়ে। জাগরণের সেইসব গান তখন রক্তে আগুন জ্বালিয়েছে'। 

রথীন্দ্রনাথ রায় আরও বলেন, 'আমাদের সহসাথীরা যেমন করে যুদ্ধ করেছেন, আমরা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পীরাও কিন্তু সেই যুদ্ধের কাজটাই করেছি। সেই সময়ে আমাদেরকে যেভাবে নির্দেশনা দেয়া হতো যে আমরা কাউকে কিছু বলতে পারবো না। আমরা চারজনের বেশি কোথাও যেতে পারবো না। সেইরকম নিয়ম মেনেই কিন্তু আমরা চলেছি। আমি দীর্ঘদিন ধরে এই দাবিটি জানিয়ে আসছি যে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রকে একটি সেক্টরের মর্যাদা দেয়া হোক।'  


রথীন্দ্রনাথ রায়ের পৈত্রিক বাড়ি বৃহত্তর রংপুরের তৎকালীন নীলফামারী মহকুমার সূবর্ণখুলী গ্রামে। সেখানেই তার বেড়ে ওঠা। তবে তার জন্ম ১৯৪৯ সালের ২৩ জানুয়ারি রংপুরের তারাগঞ্জের বগুলাগাড়ী গ্রামে মামা বাড়িতে। 

বাবা হরলাল রায় পেশায় ছিলেন চিকিৎসক। চিকিৎসা পেশা ছাপিয়ে ভাওয়াইয়া গানের অমর স্রষ্টা, সুরকার, কণ্ঠশিল্পী, এমনকি বাদ্যযন্ত্র শিল্পী ছিলেন তিনি। মা বীণাপাণি রায়ও গীতিকার ও কবি ছিলেন। ছয় ভাইবোনের মধ্যে রথীন্দ্রনাথ রায় দ্বিতীয়। 

রথীন্দ্রনাথ রায়ের স্ত্রী বিশিষ্ট রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী ও অনুষ্ঠান সঞ্চালক সন্ধ্যা রায়। বাংলাদেশ বেতার এবং টেলিভিশনের নিয়মিত সঙ্গীত পরিবেশন করতেন তিনি। ১৯৭৪ সালের নভেম্বরে বিয়ে হয় তাদের। এই দম্পতির ঘর আলো করে আসে এক মেয়ে, দুই ছেলে। মেয়ে চন্দ্রা রায়ও সঙ্গীতে বেশ সুনাম কুড়িয়েছেন। তার দুই ছেলের নাম দীপ্ত রায় এবং রঙ্গনজ্যোতি রায়। 

নীলফামারী হাই স্কুল থেকে ১৯৬৬ সালে মেট্রিক পাশ করার পর রথীন্দ্রনাথ রায় ভর্তি হয়েছিলেন ঢাকা কলেজে। সেখান থেকে ১৯৬৮ সালে ইন্টারমিডিয়েট শেষে ভর্তি তিনি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে। দেশজুড়ে তখন চলছে আন্দোলন সংগ্রাম। জাগরণের গান গেয়ে এরিমধ্যে ভীষণ পরিচিতি পেয়ে গেছেন রথীন্দ্রনাথ রায়। দেশের প্রয়োজনে তখন সর্বত্রই তার সরব উপস্থিতি।

১৯৭১ সালে শুরু হয় মহান মুক্তিযুদ্ধ। জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহে তিনি যোগ দেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে। এরপর পুরোটাই ইতিহাস। একজন স্টাফ আর্টিস্ট হিসেবে তিনি নিজেও হয়ে যান গৌরবের সেই ইতিহাসের অনবদ্য অংশ। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে সাড়া জাগানো অনেকগুলো গানে কণ্ঠ দিয়েছেন তিনি।  

দেশের গান, ভাওয়াইয়া গানের সঙ্গে অনেকগুলো চলচ্চিত্রে সুপারহিট গানও গেয়েছেন তিনি। সঙ্গীতে অনবদ্য অবদান রাখার জন্য অসংখ্য পুরস্কার পেয়েছেন রথীন্দ্রনাথ রায়। ১৯৭৩ সালে পূর্ব জার্মানিতে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইয়ুথ ফেস্টিভালে 'পলিটিক্যাল ফোক সঙ' বিভাগের প্রতিযোগিতায় তিনি 'স্পেশাল অ্যাওয়ার্ড' অর্জন করেন। সেদিন এক তরুণের কণ্ঠস্বরে রীতিমতো মুগ্ধ হয়েছিলেন বিচারকেরা। 

১৯৭৯ এবং ১৯৮১ দু'বার পেয়েছেন বাংলাদেশ ফিল্ম   জার্নালিস্ট এসোসিয়েশন-বাচসাস পুরস্কার। ভারত-বাংলাদেশের যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত 'বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না' চলচ্চিত্রের গানে কণ্ঠ দিয়ে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান 'এইচএমভি' থেকে 'ডাবল প্লাটিনাম ডিস্ক' সম্মাননা পান তিনি। 

১৯৯৫ সালে পেয়েছেন দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার একুশে পদক। মহান স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে 'ঐক্য-চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ডস’ এর ১৬তম আসরে রথীন্দ্রনাথ রায় সহ ৫০ জন কিংবদন্তি শিল্পীকে দেয়া হয় বিশেষ সম্মাননা। ২০২১ সালের নভেম্বরে নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত হয় অনন্য সেই আয়োজন। 

মানুষকে কেবল বিনোদন দেননি রথীন্দ্রনাথ রায়; পালন করেছেন দেশের প্রতি মহান দায়িত্বও। গেয়েছেন, 'ছোটদের, বড়দের, সকলের' গান। গেয়েছেন, 'গরিবের, ফকিরের, নি:স্বের' গান। গেয়েছেন, 'সব মানুষের' গান। বলেছেন, 'আমারই দেশ, সব মানুষের'। কালজয়ী সব গানের কারণে বাংলাদেশের মানুষ অনন্তকাল ভালোবাসা নিয়েই স্মরণে রাখবে এই কণ্ঠের জাদুকরকে। 

শিল্পী রথীন্দ্রনাথ রায় বলেন, 'দেশের জন্য কাজ করতে পেরেছি, মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি, এটাই আমার জন্য সবচেয়ে বড় পুরস্কার। কখনো কোন পুরস্কার পাবো, এটা ভেবে কিন্তু তখন যুদ্ধে নামিনি। আমার দেশ, প্রিয় দেশটা আরও এগিয়ে যাবে, এটাও আমার চাওয়া।' 

নিভৃতচারী এই শিল্পী এরিমধ্যে একুশে পদকে ভূষিত হয়েছেন। তবে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার 'স্বাধীনতা পদক' খুব দ্রুতই উঠুক মহান এই শিল্পীর হাতে, এটাই এখন তার কোটি ভক্তের প্রাণের দাবি।


একাত্তর/এসজে