২১০০ সালের মধ্যেই বিলুপ্ত হতে পারে মানবজাতি!

চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্য বিষয়ক বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ সাময়িকী ‘দ্য ল্যানসেট’-এ প্রকাশিত একটি নতুন গবেষণা প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, পরমাণু যুদ্ধ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) অপব্যবহার মানবজাতির ভবিষ্যৎকে চরম ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এই হুমকিগুলোর কারণে ২১০০ সালের মধ্যে মানবজাতি পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যদিও সেই সম্ভাবনা বা হার তুলনামূলকভাবে এখনও কম।

'ল্যানসেট কমিশন অন টুয়েন্টি-ফার্স্ট সেঞ্চুরি গ্লোবাল থ্রেটস টু হেলথ' শীর্ষক এই বিশদ প্রতিবেদনে আগামী ৭৫ বছরে মানবস্বাস্থ্যের ক্ষতি করতে পারে এমন ১৭টি বড় হুমকির তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। এর মধ্যে পরমাণু যুদ্ধ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার, জলবায়ু পরিবর্তন, বায়ুদূষণ, শিশুদের পুষ্টিহীনতা, স্থূলতা এবং আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সহায়তায় কাটছাঁট উল্লেখযোগ্য।

কমিশনের ৩৫ জন বিশেষজ্ঞ সদস্যের সমন্বয়ে তৈরি এই প্রতিবেদনটি জার্মানির বার্লিনে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড হেলথ সামিটে আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।

প্রতিবেদনে বিশেষভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার ও জৈব অস্ত্রের (বায়ো-ওয়েপন) হুমকির কথা তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এআই-এর অপব্যবহার করে তৈরি জৈব অস্ত্র বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের প্রাণ কেড়ে নিতে পারে এবং চরম অবস্থায় তা পুরো মানবজাতির অস্তিত্ব মুছে দিতে পারে।

এর পাশাপাশি, একটি পূর্ণাঙ্গ পারমাণবিক যুদ্ধ বায়ুমণ্ডলের উপরিভাগে বিশাল পরিমাণ ধূলিকণা ও ছাই ছড়িয়ে দেবে, যা সূর্যের আলো আটকে দিয়ে বিশ্বজুড়ে 'পারমাণবিক দুর্ভিক্ষ' তৈরি করবে। সূর্যের আলো না থাকায় শস্য উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে, যার ফলে দেখা দেবে সর্বজনীন দুর্ভিক্ষ।

গবেষকরা প্রতিটি হুমকির ফলে অসুস্থতা, বিকলাঙ্গতা বা অকালমৃত্যুর কারণে কত বছর সুস্থ জীবন নষ্ট হতে পারে, তা পরিমাপের জন্য ‘ডিজঅ্যাবিলিটি-অ্যাডজাস্টেড লাইফ ইয়ার্স’ নামের একটি সূচক ব্যবহার করেছেন। যে হুমকিগুলোর কারণে ১০০ কোটি বা তার বেশি সুস্থ জীবন নষ্ট হতে পারে, সেগুলোকে ‘মেজর ক্যাটাস্ট্রফিক থ্রেট’ বা বড় ধরনের বিপর্যয়কর হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যদি বৈশ্বিক তাপমাত্রা ৪.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের দিকে ধাবিত হয়, তবে তা মানবস্বাস্থ্যের ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলবে। তবে বিশ্ব উষ্ণায়ন ১.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে পারলে প্রায় ১৮৯ কোটি সুস্থ জীবন রক্ষা করা সম্ভব হবে।

এছাড়া, আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সহায়তায় বড় ধরনের কাটছাঁট হলে ২১০০ সালের মধ্যে প্রায় ১৫০ কোটি সুস্থ জীবন নষ্ট হতে পারে, যার ৭০ শতাংশ ক্ষতিই হবে সাব-সাহারান আফ্রিকায়, যেখানে শিশুদের পুষ্টিহীনতা ইতিমধ্যেই এক বড় সংকট।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে স্বাস্থ্যের মূল হুমকিগুলো ভিন্ন হয়। উন্নত বা উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে প্রধান সমস্যা হলো স্থূলতা ও মানসিক স্বাস্থ্য। অন্যদিকে, নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে শিক্ষার নিম্নহার ও শিশুদের পুষ্টিহীনতা স্বাস্থ্যের ওপর বড় প্রভাব ফেলে।

কমিশনের সহ-সভাপতি তথা ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিক্স অ্যান্ড ইভালুয়েশনের পরিচালক অধ্যাপক ক্রিস্টোফার মারে বলেন, আজকের নেতাদের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে পরবর্তী প্রজন্মের স্বাস্থ্য ও কল্যাণ। তিন বছর আগে যখন আমরা এই কাজ শুরু করি, তখন ভেবেছিলাম কেবল যুদ্ধ, জলবায়ু ও মহামারীই প্রধান তানটি হুমকি। কিন্তু বাস্তবে হুমকির তালিকা আরও অনেক বড়।

তিনি আরও যোগ করেন, সরকারগুলোর উচিত এই বিবিধ হুমকিগুলো আগাম অনুধাবন করা এবং তা প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ ও জনবল বরাদ্দ করা। ল্যানসেট কমিশন জানিয়েছে, বিদ্যমান ঝুঁকি পর্যালোচনা এবং নতুন হুমকি চিহ্নিত করতে তারা প্রতি বছর এই সংক্রান্ত তথ্য হালনাগাদ করবে।

তথ্যসূত্র: এনডিটিভি