বিশ্বজুড়ে বাড়ছে গড় তাপমাত্রা। একই সঙ্গে দীর্ঘায়িত হচ্ছে তাপপ্রবাহ এবং বাড়ছে অতিরিক্ত গরমজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি। তবে একই তাপমাত্রা সবার শরীরে সমান প্রভাব ফেলে না। নতুন এক বৈশ্বিক গবেষণায় দেখা গেছে, তরুণদের জন্য যে তাপমাত্রা তুলনামূলকভাবে সহনীয়, ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের জন্য সেটিই হয়ে উঠতে পারে বিপজ্জনক, এমনকি প্রাণঘাতী।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণাটি সম্প্রতি দ্য ল্যানসেট প্ল্যানেটারি হেলথ–এ প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণায় বিভিন্ন বয়সী মানুষের তাপ সহ্য করার সক্ষমতা এবং বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ার সঙ্গে তাদের ঝুঁকি কীভাবে পরিবর্তিত হতে পারে, তা বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের শরীর যে পর্যায়ে গিয়ে নিজের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা স্থিতিশীল রাখতে পারে না, সেই সীমা তরুণদের তুলনায় প্রায় ৪ দশমিক ৭ থেকে ৭ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস কম। অর্থাৎ, তরুণদের তুলনায় কম তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার সমন্বয়েই প্রবীণদের শরীর অতিরিক্ত গরমের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা হারাতে পারে।
কেন প্রবীণদের ঝুঁকি বেশি
তীব্র গরমে শরীরের অন্যতম প্রধান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হলো অতিরিক্ত তাপ বাইরে বের করে দেওয়া। ঘাম বাষ্পীভূত হওয়া এবং ত্বকের কাছের রক্তনালি প্রসারিত হওয়ার মাধ্যমে শরীর তাপ হারায়। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে ঘাম তৈরির সক্ষমতা কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে তাপ বাইরে সরিয়ে নিতে রক্তসঞ্চালন ব্যবস্থার কার্যকারিতাও কমে আসে। ফলে শরীরে জমে থাকা তাপ দ্রুত বের করা কঠিন হয়ে পড়ে।
একপর্যায়ে শরীর ঘাম ও রক্তসঞ্চালনসহ স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় আর অতিরিক্ত তাপ সামাল দিতে না পারলে তৈরি হয় ‘আনকমপেনসেবল হিট স্ট্রেস’। এ অবস্থায় শরীরের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হয় না এবং তা ক্রমাগত বাড়তে থাকে। দীর্ঘ সময় এমন পরিস্থিতিতে থাকলে গুরুতর অসুস্থতা ও মৃত্যুর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, ঝুঁকি নির্ধারণে শুধু বাতাসের তাপমাত্রা বিবেচনা করলেই হয় না। আর্দ্রতা, বাতাস চলাচল এবং শারীরিক পরিশ্রমের মাত্রাও গুরুত্বপূর্ণ। আর্দ্রতা বেশি থাকলে ঘাম সহজে বাষ্পীভূত হয় না, ফলে শরীরের স্বাভাবিক শীতল হওয়ার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়।
১.৫ ডিগ্রি উষ্ণতাতেই বড় ঝুঁকি
গবেষণার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকগুলোর একটি হলো বৈশ্বিক উষ্ণতার সঙ্গে বয়সভেদে ঝুঁকির বড় পার্থক্য। গবেষকদের মডেলিং অনুযায়ী, শিল্পপূর্ব সময়ের তুলনায় বৈশ্বিক উষ্ণতা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছালে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের জন্য বিপজ্জনক মাত্রার তাপ অনেক বেশি বিস্তৃত হয়ে উঠতে পারে। অন্যদিকে তরুণদের ক্ষেত্রে একই মাত্রার ব্যাপক ঝুঁকি দেখা দিতে পারে প্রায় ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৈশ্বিক উষ্ণতার পরিস্থিতিতে।
গবেষণার হিসাবে, বৈশ্বিক উষ্ণতা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে বিশ্বের ৬০ বছরের বেশি বয়সী মানুষের প্রায় ২২ শতাংশ—প্রায় ২৯ কোটি মানুষ—বছরে অন্তত এক মাস এমন তাপের মুখোমুখি হতে পারেন, যেখানে তাদের শরীর তাপ নিয়ন্ত্রণের সীমা অতিক্রম করবে।
অর্থাৎ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শুধু পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা কতটা বাড়ছে তা নয়, সেই তাপের মধ্যে কারা বসবাস করছেন—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
দক্ষিণ এশিয়ায় ঝুঁকি আরও বেশি
গবেষকদের মডেলিংয়ে উষ্ণ ও ক্রান্তীয় অঞ্চলে ভবিষ্যৎ ঝুঁকি বেশি দেখা গেছে। দক্ষিণ এশিয়ার মতো উষ্ণ ও ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলে তাপপ্রবাহের তীব্রতা ও স্থায়িত্ব বাড়লে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর ওপর চাপও বাড়তে পারে। বিশেষ করে তাপ থেকে সুরক্ষার অবকাঠামো সীমিত থাকা অঞ্চলে ঝুঁকি আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তাপমাত্রার সঙ্গে আর্দ্রতা যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকলে ঘাম সহজে বাষ্পীভূত হয় না। ফলে শরীরের স্বাভাবিক শীতল হওয়ার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। পানিশূন্যতা, কম বাতাস চলাচল এবং দীর্ঘ সময় গরমের মধ্যে থাকাও ঝুঁকি বাড়ায়।
প্রবীণদের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা থাকলে অতিরিক্ত গরমের প্রভাব আরও গুরুতর হতে পারে। এ কারণে তাপপ্রবাহের সময় বয়স্ক মানুষের শারীরিক অবস্থার ওপর বিশেষ নজর রাখা জরুরি।
ঘরের ভেতরেও বিপদ
তীব্র গরমের ঝুঁকি শুধু বাইরে থাকা মানুষের জন্য নয়। পর্যাপ্ত বাতাস চলাচল না করা ঘর, পুরোনো ভবন, ছাদে অতিরিক্ত তাপ জমে থাকা, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের সীমিত সুযোগ কিংবা বিদ্যুৎ সরবরাহে সমস্যা থাকলে ঘরের ভেতরেও তাপমাত্রা বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।
বিশেষ করে একা বসবাসকারী প্রবীণদের ঝুঁকি বেশি। তাপপ্রবাহের সময় তারা অসুস্থ হয়ে পড়লে দ্রুত সহায়তা পাওয়ার সুযোগ নাও থাকতে পারে। তাই বয়স্ক স্বজন ও প্রতিবেশীদের নিয়মিত খোঁজ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
তাপপ্রবাহের সময় পর্যাপ্ত পানি পান করা, ঠান্ডা ও বাতাস চলাচল করে এমন স্থানে থাকা এবং দিনের সবচেয়ে উষ্ণ সময়ে বাইরে বের হওয়া এড়িয়ে চলা জরুরি। প্রয়োজন হলে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত স্থান বা কুলিং সেন্টারে আশ্রয় নেওয়ার পরামর্শও দেওয়া হয়।
তবে তাৎক্ষণিক সুরক্ষার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে এই ঝুঁকি কমানোর মূল উপায় বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণ। শহরে গাছপালা ও সবুজ জায়গা বাড়ানো, ভবনে প্রাকৃতিক বাতাস চলাচলের সুযোগ তৈরি, তাপপ্রবাহের আগাম সতর্কতা জোরদার এবং ঝুঁকিতে থাকা মানুষের জন্য কুলিং সেন্টারের ব্যবস্থা—এসব উদ্যোগ প্রবীণদের সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবী যত উষ্ণ হচ্ছে, ততই স্পষ্ট হয়ে উঠছে—তাপপ্রবাহের ঝুঁকি সবার জন্য এক নয়। বিশেষ করে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সীদের ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার সমন্বয়েই শরীর তাপ নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা হারাতে শুরু করতে পারে। ফলে উষ্ণতর ভবিষ্যতে প্রবীণদের সুরক্ষা এখন শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয় নয়; এটি জলবায়ু অভিযোজনেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।