মহাবিশ্ব সৃষ্টির রহস্যভেদে মহাকাশে ‘জেমস ওয়েব’

মহাকাশ রহস্যের জাল ভেদ করতে সেখানে ৩০ বছর ধরে ঘুরছে বিশাল আকৃতির একটি টেলিস্কোপ, নাম হাবল। মহাকাশে অবিরত ছবি তুলছে এই হাবল। 

সেই সব ছবি পৃথিবীতে বসে বিশ্লেষণ করে মহাকাশের বিভিন্ন রহস্য ও অংকের হিসাব মিলিয়ে নিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন বিজ্ঞানীরা। মানুষকে জানাচ্ছেন বিস্ময়কর সব তথ্য।  

কিন্তু হাবলের বয়স হয়ে গেছে। এটির পারফর্মেন্সেও আর সন্তুষ্ট থাকা যাচ্ছে না। তাই এবার আরও বেশি শক্তিশালী একটি টেলিস্কোপ মহাকাশে পাঠালো মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা- নাসা।

হাবলের ছোট ভাইটির নাম জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ। শনিবার (২৫ ডিসেম্বর) বড়দিনেই মহাকাশে রওনা হয়ে গেছে ব্রহ্মাণ্ড ফুঁড়ে দেখার সেরা ‘চোখ’ এই টেলিস্কোপ।  


বাংলাদেশ সময় ছয়টা বিশ মিনিটে ফ্রেঞ্চ গায়ানার কোরোউ থেকে ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির বানানো অত্যন্ত শক্তিশালী ‘আরিয়ান-৫’ রকেটে চেপে মহাকাশে পাড়ি দিয়ে ‘জেমস ওয়েব’।

এখন পর্যন্ত মহাকাশে পাঠানো এটিই সবচেয়ে শক্তিশালী টেলিস্কোপ। মহাকাশে মহা বিস্ফোরণের রহস্য জানাই হবে এই টেলিস্কোপের বড় উদ্দেশ্য। 

১৩৮০ কোটি বছর আগের বিস্ফোরণ থেকে কিভাবে আমাদের মহাবিশ্ব তৈরি হলো, কিভাবে জন্ম নেয় তারা, কিভাবে তৈরি হয় ছায়াপথ তা জানার চেষ্টা করবে জেমস ওয়েব।

৩০ বছর আগে একই উদ্দেশ্যে মহাকাশে পাঠানো হয় হাবল টেলিস্কোপকে। সেটি দাপটের সঙ্গে কাজ করলেও, ব্রহ্মাণ্ডের ১২০০ কোটি বছরের বেশি ইতিহাস খুঁড়ে দেখার ক্ষমতা নেই। 

আর এ কারণেই জেমস ওয়েবকে মহাকাশে পাঠানোর চিন্তা শুরু করেন বিজ্ঞানীরা। উৎক্ষেপণের আধ ঘণ্টা পরেই খুলে গেছে টেলিস্কোপের জ্বালানি জোগানো সুবিশাল সোলার প্যানেলগুলো।

ছয় দিন পর খুলে যাবে টেলিস্কোপের বিশাল সানশিল্ডগুলো। যা তীব্র সূর্যরশ্মির ঝাপটা আর তাপ থেকে বাঁচাবে জেমস ওয়েবকে। এই সময়ের মধ্যেই চাঁদকে পেছনে ফেলবে টেলিস্কোপটি।

আর দ্বিতীয় সপ্তাহে খুলে যাবে টেলিস্কোপের সুবিশাল আয়না। তার ছয় মাস পর থেকে ব্রহ্মাণ্ডকে খুঁড়ে দেখার কাজে নামবে জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ।

জেমস ওয়েবের স্থায়ী আবাস হবে পৃথিবী থেকে থেকে ১০ লক্ষ মাইল দূরে। একটি স্কুল বাসের সমান ওজনের এই টেলিস্কোপ সেখান থেকে প্রদক্ষিণ করবে সূর্যকে। 

হাবল যে প্রযুক্তিতে চলতো, সেটি থেকে ভিন্ন প্রযুক্তিতে চলবে এই টেলিস্কোপ। হাবল ঘুরে বেড়ায় পৃথিবীর চারিদিকে। আর জেমস ওয়েব প্রদক্ষিণ করবে সূর্যকে। 

মহাকাশে এমন একটি টেলিস্কোপ পাঠানোর জন্য ২৫ বছর ধরে অপেক্ষায় ছিলেন বিজ্ঞানীরা। এই টেলিস্কোপ মহাকাশে প্রাণের উৎসের উত্তর খুঁজে এনে দিতে পারে। 

বিশ্বের ১৪টি দেশের বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলী মিলে তৈরি করেছেন এই মহা টেলিস্কোপটি। যাকে বলা হচ্ছে মানুষের তৈরি প্রথম টাইম মেশিন। 

টেলিস্কোপটি এতই সংবেদনশীল যে, এটি পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্বে অবস্থিত বস্তুকেও শনাক্ত করতে পারে। সেই সঙ্গে ধারণ করবে মহাকাশের নানা অজানা স্থানের ছবি।

নাসা বলেছে, জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ এখন পর্যন্ত নির্মিত বৃহত্তম ও সবচেয়ে শক্তিশালী স্পেস টেলিস্কোপ। তিন দশক ধরে ১০ বিলিয়ন ডলার খরচ করে এটি বানানো হয়েছে। 

জেমস ওয়েব প্রথম নক্ষত্রের সৃষ্টি এবং মহাবিশ্বের সূচনা সম্পর্কে আরও তথ্য এবং ব্রহ্মাণ্ডের আরও গভীরে পর্যবেক্ষণ করতে পারবে বলে আশাবাদও জানিয়েছে নাসা।

নাসার অ্যাপোলো প্রোগ্রামের প্রধান বিজ্ঞানী জেমস ওয়েবের নামে এই টেলিস্কোপের নামকরণ। টেনিস কোর্টের সাইজের এই টেলিস্কোপ মোট চারটি যন্ত্রের সাহায্যে ছবি তুলবে।

একাত্তর/এআর