ইউক্রেন অভিযানের দ্বিতীয় পর্বে রাশিয়ার কৌশল পরিবর্তন

ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান ৩২তম দিনে গড়িয়েছে। এরিমধ্যে ক্রেমলিন জানিয়েছে, তাদের অভিযানে প্রথম ধাপ শেষ হয়েছে। এবার নজর দেবে ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে। কিয়েভের দাবি, তাদের প্রতিরোধের মুখে অভিযানের আকার কমিয়ে আনতে বাধ্য হয়েছে ক্রেমলিন।

পরিস্থিতি বলছে, ইউক্রেনের বিভিন্ন স্থানে উপর্যুপরি গোলাবর্ষন ও মিসাইল আক্রমল কমিয়েছে রুশ সেনারা। এরমধ্যেই হামলার প্রায় বিধ্বস্ত হয়েছে বন্দর নগরী মাউরিপোল। নতুন করে হামলা হয়েছে শান্ত ও নিরিবিল লিভিভ শহরে। নতুন করে দখলে নিয়েছে আরো একটি শহর।

রুশ অভিযানের পর থেকে এরিমধ্যে ইউক্রেন থেকে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ৩৫ লাখের বেশি মানুষ আশপাশের দেশগুলোতে আশ্রয় নিয়েছে। মস্কোর আগ্রাসান ঠেকাতে এখনও অব্যাহত আছে বন্যার মতো পশ্চিমাদের আরোপ করা একের পর এক নিষেধাজ্ঞা।

জাতিসংঘসহ একাধিক আন্তর্জাতিক সংস্থা ও গণমাধ্যমগুলো বলছে, ইউক্রেন হামলার শুরুর পর থেকে রোববার (২৭ মার্চ) পর্যন্ত এই ৩২ দিনে কূটনৈতিক ও যুদ্ধের ময়দানে বেশি কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনা ভবিষ্যতে এ যুদ্ধে প্রভাব ফেলবে।


মিত্ররাষ্ট্র ও জ্বালানি 

যুদ্ধের এক মাস না যেতেই বিশ্বের পরাশক্তিগুলো শত্রু-মিত্র চিহ্নিত করতে ব্যস্ত। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ রাশিয়ার বিরুদ্ধে নতুন জোট গড়ছে। অন্যদিকে রাশিয়াও পিছিয়ে নেই। এরইমধ্যে, চীনের মতো পরাশক্তিকে নিজেদের দলে রাখতে সক্ষম হয়েছেন পুতিন। 

রাশিয়ার বন্ধু দেশ নয় এমন ৩৮ দেশের কাছে জ্বালানি বিক্রির ক্ষেত্রে রাশিয়ার মুদ্রা 'রুবল' ছাড়া অন্য কোনো দেশের মুদ্রা গ্রহণ করবে না পুতিন প্রশাসন।এমন ঘোষণার ফলে বিপাকে পড়েছে পশ্চিমা দেশগুলো। আন্তর্জাতিক বাজারে এরইমধ্যে বেড়েছে রুবল ও রাশিয়ার গ্যাসের দাম।   

আরও দৃঢ় হচ্ছে চীন-রাশিয়ার সম্পর্ক  

রাশিয়ার গ্যাস, তেল, কয়ালা নিষিদ্ধ করার ফলে যুক্তরাষ্ট্রে বেড়েছে জ্বালানির দাম। গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধিতে নতুন রেকর্ড হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। এর ফলে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপে পড়েছে বাইডেন সরকার। তারপরও গরম কথা আর কাজে পরিস্থিতি ঘোলাটে করছে ওয়াশিংটন।

রাশিয়ার জ্বালানির বিকল্প খুঁজতে সৌদি আরব, ইরান, ভেনিজুয়েলায় ছুটছে পশ্চিমা নেতারা। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো দেশ পশ্চিমাদের ডাকে সাড়া দেয়নি। বিভিন্ন পরিসংখ্যান বলছে, জ্বালানি নিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে ধস্তাধস্তি করে লাভ হবে না পশ্চিমাদের।

রাশিয়ার জ্বালানির দিকে চীনের নজর রয়েছে। দেশটি রাশিয়া থেকে আরও জ্বালানি আমদানি করবে বলে ধারণা বিশেষজ্ঞদের। এছাড়া ভারত, পাকিস্তান ও কিউবা নতুন করে জ্বালানি কিনতে পারে রাশিয়া থেকে। ফলে জ্বালানির বাজার নিয়ে রাশিয়ার চিন্তা কিছু নেই।

ব্রাসেলসে ন্যাটো সামরিক জোটের নেতারা

রাশিয়ার জ্বালানির পক্ষে শক্ত অবস্থা জার্মানির। দেশটি বলছে, তারা এখনই রাশিয়ার জ্বালানি বন্ধ করবে না। ফলে ন্যাটো জোটে নতুন করে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির জেলেনস্কি জ্বালানি উৎপাদনকারী দেশগুলোকে উৎপাদন বাড়ানোর আহ্বান জানান, যাতে রাশিয়া তার তেল ও গ্যাস সম্পদ ব্যবহার করে অন্য দেশগুলোকে 'ব্ল্যাকমেইল' করতে না পারে।


যুদ্ধ ও কূটনীতি 

সবশেষ মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন মন্তব্য করেন, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন আর রাশিয়ার ক্ষমতায় থাকতে পারবেন না। বাইডেনের মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেছেন, পুতিন ক্ষমতায় থাকবেন কি না, সে সিদ্ধান্ত বাইডেন নেবেন না।

তবে ক্রেমলিনের প্রতিক্রিয়ার জবাবে হোয়াইট হাউস বলেছে, বাইডেন কথাটা সেভাবে বলতে চাননি। ওই কথা বাইডেনের ভাষণে লেখা ছিলো না। 

ইউক্রেনের রাষ্ট্রপতি ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, পশ্চিমারা ইউক্রেনকে আরও সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করবে।

ন্যাটো সম্মেলনে বাইডেন

এদিকে পোলিশ সীমান্ত থেকে মাত্র ৬০ কিলোমিটার দূরে লিভিভে আরও চার ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। ইউক্রেনে রাশিয়া আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে, এমনটাই শঙ্কা ইউরোপীয় নেতাদের। 

ইউক্রেন বলেছে, রুশ বাহিনী কিয়েভের পাশের শহর স্লাভ্যুতিচ নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। এই শহরে চেরনোবিল পারমাণবিক কেন্দ্রের কর্মীরা বাস করেন।

অন্যদিকে মৃত্যুর গুজব উড়িয়ে দিয়ে দুই সপ্তাহ পর প্রকাশ্যে এলেন রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রী সের্গেই শোইগু। বেশ কয়েকদিন ধরে রাশিয়ার অনেক কর্মকর্তাকে গণমাধ্যমে দেখা না যাওয়ায় অনেক ধরনের গুজবের জন্ম হয়।  

আকাশে বেড়েছে রাশিয়ার দাপট

যুদ্ধের ৩২তম দিনে ইউক্রেনের সেনারা রাজধানী কিয়েভের আশেপাশের কিছু এলাকায় রুশ বাহিনীর বিরুদ্ধে পাল্টা হামলা চালাচ্ছে। তবে রাশিয়ার বিমান হামলার সামনে ইউক্রেন অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছে।  

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার জন্ম দিয়েছেন ব্রিটিশ পররাষ্ট্র সচিব লিজ ট্রাস। তিনি বলেছেন, রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হতে পারে যদি মস্কো পূর্ণ যুদ্ধবিরতিতে প্রতিশ্রুতি বদ্ধ হয় এবং তার সৈন্য প্রত্যাহার করে।


শরণার্থী ও হতাহত

ইউক্রেন যুদ্ধের সবচেয়ে বিপদজনক বিষয়টি হলো, এ যুদ্ধে তথ্যের ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। ফলে কোনো পক্ষের তথ্যকে সহজে গ্রহণ করছে না অন্য পক্ষ। ফলে আরও কঠিন হয়ে উঠছে ইউক্রেনের বেসামরিক মানুষের জীবন।

জাতিসংঘ বলছে, রুশ আগ্রাসন শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত ৩৭ লাখের বেশি মানুষ ইউক্রেন ছেড়ে পালিয়েছে। এদের প্রায় ৯০ শতাংশই নারী ও শিশু।জাতিসংঘ অনুমান করেছে যে আরও ৬৫ লাখ মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছে।

কিয়েভ ছেড়ে পালাচ্ছে সাধারণ মানুষ

আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবক সংস্থা রেড ক্রসকে রাশিয়ার রোস্তভ-অন-ডনে অফিস না খুলতে আহবান জানিয়েছে ইউক্রেন। দেশটির শঙ্কা, ওই অঞ্চলে রেডক্রসের অফিসের কারণে রাশিয়া মানবিক করিডোর, ইউক্রেনিয়দের অপহরণ ও জোরপূর্বক নির্বাসনকে আরও প্রভাবিত করবে।

এদিকে, চেরনিহিভ মেয়র বলেছেন, ৪৪ জন গুরুতর আহত রোগি রয়েছেন, যার মধ্যে তিন জন শিশুও রয়েছে। রুশ বাহিনী শহরটিকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়ায় ওই রোগীরা চিকিৎসা পাচ্ছেন না। 

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ইউক্রেনে মানবিক সহায়তা এবং বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা দিতে আনা প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছে বাংলাদেশ। বৃহস্পতিবার (২৪ মার্চ) জাতিসংঘে প্রস্তাবটি ১৪০ ভোট পেয়ে পাস হয়। এতে প্রায় এক মাস আগে প্রতিবেশী দেশটিতে হামলা চালিয়ে 'ভয়াবহ' মানবিক পরিস্থিতি তৈরি করার জন্যরাশিয়ার সমালোচনা করা হয়েছে।

কিয়েভের অধিকাংশ এলাকা এখন ধ্বংসস্তূপ

ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের এক মাস পর শরণার্থী নিতে আগ্রহ দেখিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বাইডেন প্রশাসন ঘোষণা দিয়েছে, তারা সর্বোচ্চ এক লাখ ইউক্রেনীয় শরণার্থীকে আশ্রয় দিতে রাজি।  

ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার এক পর ন্যাটো সামরিক জোটের জ্যেষ্ঠ একজন কর্মকর্তা বলেছেন, এক মাসে সাত হাজার থেকে ১৫ হাজার রুশ সৈন্য নিহত হয়েছে। তবে সরকারিভাবে আহত ও নিহতের তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করছে নারাশিয়া। 

ইউক্রেনও নিজেদের সৈন্য নিহতের ব্যাপারে তথ্য প্রকাশ করছে না। প্রায় দুই সপ্তাহ আগে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছিলেন, তাঁর দেশের ১৩০০ সৈন্য প্রাণ হারিয়েছে।

আরও পড়ুন: সন্তান হারানোর কোন ক্ষতিপূরণ চান না প্রীতির বাবা

ইউক্রেন যুদ্ধ শুধুমাত্র ইউক্রেন বা রাশিয়ার মানুষের একারযুদ্ধ নয়। বরং বিশ্বের অধিকাংশ দেশের মানুষ এ যুদ্ধের উত্তাপ টের পাচ্ছে।

জাতিসংঘ বলছে, এই যুদ্ধ এভাবে এগোতে থাকলে দ্রুত খাদ্য সংকটে পড়বে বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ। বিশেষ করে পিছিয়ে থাকা দেশগুলো।

কারণ ইউক্রেন ও রাশিয়া দুনিয়ার সবচেয়ে বড় গম উৎপাদনকারী দেশ। একইসাথে এই দেশ দুইটি অনেক পণ্য, কাঁচামাল ও জ্বালানি বিশ্বব্যাপী সরবরাহ করে। ফলে ইউরোপ থেকে এশিয়া প্রতিটা দেশই চাচ্ছে এই যুদ্ধের একটা শান্তিপূর্ণ সমাধান হোক। 

তবে রাশিয়ার এক দাবি, ন্যাটো কোনোভাবেই ইউক্রেনে ঢুকতে পারবে না। এক্মাত্র এই শর্তেই বন্ধ হতে পারে যুদ্ধ। 

 

একাত্তর/আরবিএস