স্কুলশিক্ষক থেকে ভারতের প্রেসিডেন্ট

দ্রৌপদী মুর্মুর অবিশ্বাস্য যাত্রা

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ভারতের প্রথম আদিবাসী রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস গড়েছেন দ্রৌপদী মুর্মু। একেবারে নিচুতলা থেকে ভারতের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে পৌঁছানো এই আদিবাসী নেত্রীকে ভাল করে চেনেনই না অনেকে। জানেন না তার অসাধারণ যাত্রার গল্প। 

জন্ম ও ব্যক্তিগত জীবন

ভারতের স্বাধীনতার পর জন্ম নেয়া প্রথম রাষ্ট্রপতি হতে চলেছেন দ্রৌপদী মুর্মু। ১৯৫৮ সালে ওডিশার ময়ূরভঞ্জে এক সাঁওতালি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। বাবা বিরঞ্চি নারায়ণ টুডু ছিলেন গ্রামের পঞ্চায়েত প্রধান। মুর্মুর দাদাও একই দায়িত্ব পালন করেছেন।  

নিজ জেলা থেকে স্কুলশিক্ষা গ্রহণের পর তিনি ভুবনেশ্বরের রামাদেবী মহিলা মহাবিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন তিনি। কর্মজীবন শুরু করেন ওডিশা রাজ্য সরকারের সেচ বিভাগে জুনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে। এরপর শিক্ষক হিসেবে চাকরি করেন শ্রী অরবিন্দ ইন্টেগ্রাল এডুকেশন সেন্টার স্কুলে। 

তবে, ব্যক্তিগত জীবনটা একেবারেই মসৃণ ছিল না দ্রৌপদী মুর্মুর। একসময় পরপর তিন সন্তান ও স্বামীর মৃত্যুতে তিনি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছিলেন। প্রথমে রহস্যজনকভাবে মৃত্যু হয়েছিল তাঁর বড় ছেলে লক্ষ্মণ মুর্মুর। তিন বছর পর মৃত্যু হয় ছোট ছেলে সিপুন মুর্মুর।

এর এক বছর পর বিদায় নিয়েছিলেন তাঁর স্বামী শ্যাম চরণ মুর্মু। ছোট মেয়ের মৃত্যু হয়েছিল মাত্র তিন বছর বয়সে। সেসময় অবসাদ থেকে বেরিয়ে আসার জন্য তিনি ধ্যান করা শুরু করেছিলেন।


রাজনৈতিক জীবন

রাজনীতিতে আসার পর দ্রৌপদী মুর্মু ধাপে ধাপে কাউন্সিলর, এমএলএ এবং মন্ত্রী হন। ২৫ বছর আগে প্রথমে ওড়িশার রায়রাংপুর নগর পঞ্চায়েত থেকে কাউন্সিলর নির্বাচনে জয়লাভ করেন।

এর তিন বছর পর ২০০০ সালে রায়রাংপুর থেকেই প্রথম বিধায়ক নির্বাচিত হন। ২০০২ থেকে ২০০৪ সালের মধ্যে বিজেপি-বিজেডি সরকারের মন্ত্রী ছিলেন। 

এরপর ২০১৫ সালে ঝাড়খণ্ডের নবম গভর্নর হন। ঝাড়খণ্ডের গভর্নরের পুরো মেয়াদ শেষ করা প্রথম ব্যক্তি তিনি। 

২০১৬ সালে আদিবাসীদের ভূমি অধিকার নিয়ে দুটি শতবর্ষী আইন সংস্কার করার উদ্যোগ নেন বিজেপিশাসিত ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী রঘুবর দাস। এ সংস্কারের ফলে আদিবাসীদের জমি বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার সহজ হয়ে যেতো। 

তবে এর বিরুদ্ধে রাজ্যের আদিবাসীরা বিক্ষোভ করলে ২০১৭ সালে বিলটি ফিরিয়ে দেন মুর্মু। এই আইন সংস্কার কীভাবে আদিবাসীদের উপকার করবে, সরকারের কাছে তাও জানতে চান তিনি। 

নিজের রাজনৈতিক দলের বিতর্কিত আইনে সমর্থন না দেয়ার কারণে ব্যাপকভাবে নন্দিত হন দ্রৌপদী মুর্মু। 


জীবনাচরণ

দ্রৌপদী মুর্মুর প্রতিদিনের জীবন একেবারে নিয়মে বাঁধা। এতটুকু নড়চড় হয় না। যত ব্যস্ততাই থাকুক, ভোরবেলা হাঁটা, ধ্যান করা এবং যোগব্যায়াম করা বাদ দেন না তিনি। 

আরও পড়ুন: তীব্র তাপদাহে পর্তুগাল ও স্পেনে ১৭০০ মানুষের মৃত্যু

প্রতিদিন ভোর সাড়ে তিনটায় ঘুম থেকে ওঠেন। তারপর বের হন হাঁটতে। বাড়ি ফিরে যোগব্যায়াম করেন। সময়নিষ্ঠ বলে তাঁর খ্যাতি আছে। শোনা যায়, কোথাও কখনই দেরিতে পৌঁছান না তিনি।

দ্রৌপদী মুর্মু সবসময়ই তাঁর সঙ্গে দুটি বই রাখেন। একটি ইংরেজি অনুবাদের বই, অন্যটি ভগবান শিবের স্তবের পুস্তিকা। কথাবার্তা বলতে যাতে অসুবিধা না হয়, সেই কারণেই সর্বত্র তিনি ইংরেজি অনুবাদের বইটি বহন করেন। আর প্রতিদিন ধ্যান করার সময় পুস্তিকা থেকে শিব স্তব করে থাকেন তিনি।


একাত্তর/এসজে