ভারতের ছাত্র-যুবদের কর্মসংস্থান এবং শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের দাবি এবার এক অদ্ভুত ও নজিরবিহীন রূপ নিল দিল্লির বুকে। সপ্তাহজুড়ে খবরের শিরোনামে থাকার পর, আজ শনিবার ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির রাজপথে নেমে এলেন ‘ককোরোচ জনতা পার্টি’ বা ‘সিজেপি’-র শত শত তরুণ সমর্থক। দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর হিন্দুত্ববাদী দল ‘ভারতীয় জনতা পার্টি’ (বিজেপি)-র নামের সাথে মিল রেখে তৈরি এই ব্যঙ্গাত্মক সোশ্যাল মিডিয়া আন্দোলনটি ইতিমধ্যেই ভারতের কোটি কোটি তরুণের নজর কেড়েছে।
শনিবার দিল্লির সংসদ ভবনের অদূরে অবস্থিত বিখ্যাত প্রতিবাদস্থল যন্তর মন্তরে জড়ো হন শত শত যুবক-যুবতী। তাঁদের অনেকের মুখেই ছিল তেলাপোকার মুখোশ। ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের একটি বিতর্কিত মন্তব্যকে কেন্দ্র করেই মূলত এই আন্দোলনের সূত্রপাত। গত মাসে একটি আদালতের শুনানির সময় প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত সরকারবিরোধী সমালোচনা করা তরুণদের ‘তেলাপোকা’ এবং ‘পরজীবী’র সাথে তুলনা করেছিলেন। পরে তিনি দাবি করেন, তাঁর বক্তব্যকে ভুল প্রসঙ্গে টেনে বড় করা হয়েছে। কিন্তু বোস্টন ইউনিভার্সিটির ছাত্র ও রাজনৈতিক যোগাযোগ কৌশলবিদ অভিজিৎ দিপকে এই অপমানকেই পুঁজি করে একটি প্যারোডি বা ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক দল খোলার অনুপ্রেরণা পান।

ওয়েবসাইট ও সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট খোলার মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে সিজেপি-র ইনস্টাগ্রাম পেজের ফলোয়ার সংখ্যা রকেট গতিতে বেড়ে আজ শনিবার পর্যন্ত ২ কোটি ২২ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। দলটির মূল স্লোগান হলো, তরুণদের জন্য, তরুণদের দ্বারা, তরুণদের একটি রাজনৈতিক ফ্রন্ট।
শনিবারের এই প্রতিবাদের মূল লক্ষ্য ছিল ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করা। গত মে মাসে ভারতের জাতীয় স্তরের একটি পরীক্ষার অনিয়মকে কেন্দ্র করে যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল, তা দ্রুতই দেশের নড়বড়ে শিক্ষা ব্যবস্থা এবং তীব্র বেকারত্বের বিরুদ্ধে এক বিরাট গণঅসন্তোষে রূপ নেয়। আজ রাজপথে সিজেপি সমর্থকদের মুখে স্লোগান ছিল, "তেলাপোকারা আসছে, ধর্মেন্দ্র প্রধানের দিন শেষ!"

মিছিলের আয়োজকরা অংশগ্রহণকারীদের হাতে ভারতের জাতীয় পতাকার পাশাপাশি একটি করে বই নিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছিলেন, যা সবার জন্য শিক্ষার অধিকার ও সমান সুযোগের প্রতীক। আন্দোলনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল এর শান্তিপূর্ণ চরিত্র। আয়োজকরা শুরুতেই পুলিশ বা প্রশাসনের সাথে কোনো ধরণের সংঘর্ষে না জড়ানোর জন্য বিক্ষোভকারীদের কড়া নির্দেশনা দিয়েছিলেন। তা সত্ত্বেও কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করে দিল্লি পুলিশ; যন্তর মন্তর এবং বিমানবন্দর এলাকায় বসানো হয় স্টিলের ব্যারিকেড।
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে জন্ম নেওয়া যুব আন্দোলন এই প্রথম নয়। এর আগে বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও নেপালে সরকারবিরোধী গণআন্দোলনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তরুণেরা এক যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করেছিল। ভারতের এই যুবকরা এখন ‘তেলাপোকা’কে তাদের টিকে থাকার ও লড়াইয়ের অন্যতম প্রতীক হিসেবে বেছে নিয়েছেন। ব্যঙ্গ করে তারা নিজেদের ‘বেকার এবং সারাক্ষণ অনলাইনে থাকা’ একঝাঁক তরুণ বলে পরিচয় দিচ্ছেন।

ভারতে মোট জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশেরও বেশি তরুণ হওয়া সত্ত্বেও তারা চরম কর্মসংস্থান সংকটের মুখোমুখি। ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব এবং সনাতনী রাজনীতির প্রতি তীব্র মোহভঙ্গের কারণেই তরুণদের এই ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটছে। অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী মোদীর দল বিজেপির সমর্থকেরা এই সিজেপি-কে ‘সোশ্যাল মিডিয়ার সস্তা চমক’ বলে উড়িয়ে দিচ্ছেন।
তাঁদের দাবি, ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামের এই লাইক-ফলোয়ারের জোয়ার কখনোই মাঠের রাজনীতিতে টিকবে না এবং এই ক্ষণস্থায়ী উন্মাদনা খুব দ্রুতই বাতাস থেকে মিলিয়ে যাবে। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ভার্চুয়াল জগৎ থেকে বেরিয়ে দিল্লির রাজপথে তেলাপোকার মুখোশ পরা শত শত তরুণের এই গর্জন ভারতের নীতিনির্ধারকদের কপালে যে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা
