তাইওয়ানকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন প্রদেশ দাবি করে চীন। মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে দ্বীপটি একদিন যুক্ত হবে ধারণা তাদের। প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করা হবে। তাইপে নিয়ে এ অবস্থান বেইজিংয়ের।
মঙ্গলবার (২ আগস্ট) সেই দ্বীপে গেছেন মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি। ২৫ বছরে মার্কিন কোনো শীর্ষ কর্মকর্তার প্রথম তাইওয়ান সফর। এমন সফরের বিরোধিতায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে চীন।
চীনা কমিউনিস্ট পার্টির মানবাধিকার কর্মকাণ্ডের কট্টর সমালোচক পেলোসির এ সফরকে তাইওয়ানের দীর্ঘদিনের স্বাধীনতার দাবির প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন হিসেবে দেখছে বেইজিং। মার্কিন রাজনীতিকে আলিঙ্গনের মধ্যদিয়ে দ্বীপের প্রেসিডেন্ট হুঁশিয়ার করেছেন, দুই কোটি ৩৫ লাখ জনসংখ্যার তাইওয়ান চীনা চাপে নত হবে না। জবাবে সামরিক মহড়া আরো বিস্তৃত করার ঘোষণা দিয়েছে বেইজিং।
এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন জাগতেই পারে পেলোসির সফরে চীন ক্ষুব্ধ কেন অথবা কে এই ন্যান্সি পেলোসি আর কেন তিনি সফর করলেন তাইওয়ানে?
রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম পেলোসি মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে প্রথম নারী স্পিকার। ভাইস প্রেসিডেন্ট কামালা হ্যারিসের পরই প্রেসিডেন্টের দৌড়ে রয়েছেন তিনি।
১৯৯১ সালে বেইজিং সফরকালে তিয়ানানমেন চত্বরে যান পেলোসি। যেখানে ১৯৮৯ সালে গণতন্ত্রপন্থী ছাত্র আন্দোলনে রক্তক্ষয়ী অভিযান চালানো হয়। পেলোসির ছোট্ট ব্যানারে সম্মান জানিয়ে লেখা ছিলো, তাদের জন্য যারা চীনে গণতন্ত্রের জন্য জীবন দিয়েছে।
৮২ বছর বয়সী পেলোসি তাইওয়ান সফরের ব্যাখ্যায় লিখেছেন, গণতান্ত্রিক অংশীদার তাইওয়ানের আত্মরক্ষা, স্বাধীনতা রক্ষায় দ্ব্যর্থহীনভাবে পাশে আছে যুক্তরাষ্ট্র।
বৃহৎ পরিসরে বিশ্ব যখন চীনা কমিউনিস্ট পার্টির আগ্রাসনের মুখোমুখি, তখন পেলোসির তাইওয়ান সফর বৈশ্বিক কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধেই অবস্থান।
পেলোসি একমাত্র মার্কিন আইন প্রণেতা নন যিনি তাইওয়ান গেছেন। ১৯৯৭ সালে প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার নিউট গিংরিচ গিয়েছিলেন। তবে তার সফরে দ্বীপের স্ট্যাটাস নিয়ে কোনো শঙ্কা তৈরি হয়নি। বলেছেন, এশিয়া অঞ্চল বিশেষজ্ঞ শন কিং। তিনি মনে করেন, যে কোনো বাড়তি উত্তেজনার জন্য চীনের হুমকি, আগ্রাসী মনোভাব দায়ী থাকবে।
পেলোসির সফর নিয়ে চীনের প্রতিক্রিয়া
১৯৪৯ সালে গৃহযুদ্ধের সময় মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় তাইওয়ান। আগেই পশ্চিমা রাজনৈতিকের তাইওয়ান সফরের নিন্দা জানিয়েছে চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। পেলোসি তাইওয়ানে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গে কড়া বার্তা দিয়েছে, চীনা প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, পার্লামেন্টের স্ট্যান্ডিং কমিটি, ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসসহ কমিউনিস্ট পার্টির বিভিন্ন সংগঠন।
তারা সতর্ক করে বলেছে, পেলোসির সফর তাইওয়ানকে বিপর্যয়ের অতল গহ্বরে ঠেলে দেবে, জনগণের জন্য বয়ে আনবে সীমাহীন দুর্ভোগ।
চীনা সামরিক বাহিনী জানায়, তারা স্পর্শকাতর তাইওয়ান প্রণালী এবং দ্বীপাঞ্চলের চারপাশের জলসীমায় ধারাবাহিকভাবে দীর্ঘপাল্লাসহ তাজা অস্ত্রের মহড়া করবে। জবাবে দ্বীপাঞ্চলের প্রেসিডেন্ট হুঁশিয়ার করেন, চীনা চাপের কাছে নত হবে না তাইওয়ান।
বুধবার পেলোসির সঙ্গে প্রেসিডেন্ট সাই ইংওয়েনের সাক্ষাতের কিছুক্ষণ আগে চীন জানায়, বেইজিং থেকে অনুদান নেয়া দুটি সংগঠন, চারটি কোম্পানির উপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে বেইজিং। পেলোসির সফরের প্রতিবাদে তাইওয়ান থেকে কয়েক হাজার খাদ্যপণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করেছে চীন।
চীন ক্ষুব্ধ যে কারণে
গত সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গে ফোনালাপে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সতর্ক করে বলেছেন, তাইওয়ান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের আগুন নিয়ে খেলা উচিত নয়।
বেইজিং ভিত্তিক গবেষক অ্যান্ডি মোক বলেন, সালামি স্লাইসিং ট্যাকটিসের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র বিচ্ছিন্ন অঞ্চল তাইয়ান ঘিরে চীনের অবস্থানকে ক্রমেই অস্বীকার করছে। এ কারণেই তীব্রভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে বেইজিং।
তিনি বলেন, সামরিকসহ চীন যদি শক্তিশালীভাবে প্রতিক্রিয়া না জানায় তাহলে অন্যরা এর সুযোগ নেবে। শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, বিশ্ব অন্যরাও তাইওয়ানকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করার চীনের প্রচেষ্টাকে অবমূল্যায়ন করবে। প্রতিক্রিয়া দেখানো বেইজিংয়ের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তাইওয়ান সফর থেকে পেলোসিকে বিরত রাখার ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট বাইডেনের ক্ষমতা ছিল সীমিত। কিছু মার্কিন বিশেষজ্ঞ পরামর্শ দিয়েছেন, পেলোসির সফর চীনের একদলীয় শাসন ব্যবস্থা খুব একটা আমলে নেবে না। তবে মোক জানান, মার্কিন রাজনীতির কৌশল বেইজিং ভালোভাবে জানে। পেলোসির সফর বন্ধে বাইডেন অনেক কিছু করতে পারতেন।
তিনি (পেলোসি) মার্কিন সামরিক বিমানে উড়ে এসেছেন। যোগ করেন মোক। তিনি আরো বলেন, বাইডেন যদি চাইতেন, তিনি বলতে পারতেন, আমি দুঃখিত, তাইওয়ানে যাওয়ার জন্য আমরা আপনাকে বিমান দিতে পারছি না। কিন্তু সেটা তিনি করেননি।
তাইওয়ান ইস্যুতে মার্কিন অবস্থান কি?
কয়েক দশক ধরে তাইওয়ান ইস্যুতে একটি অস্পষ্ট কৌশল মেনে চলছে ওয়াশিংটন। আসল কথা হলো দ্বীপে চীন আক্রমণ করলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের রক্ষায় আসবে কি না তাইপে এ বিষয়ে নিশ্চিত নয়। তার অর্থ এই নয় যে, বেইজিং নিশ্চিত হতে পারে, যুক্তরাষ্ট্র চুপ করে বসে থাকবে।
কয়েকটি নথির ভিত্তিতে তাইওয়ান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি পরিচালিত হয়। যা দেখে তাইপে ইস্যুতে ওয়াশিংটনের অবস্থান বোঝা যায়। তারমধ্যে ১৯৭২ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত চীন-যুক্তরাষ্ট্রের দেয়া তিনটি যৌথ বিবৃতি। একটিতে বলা হয়েছে, তাইওয়ান চীনের অংশ। বেইজিংয়ের এ দৃষ্টিভঙ্গিকে স্বীকার করে ওয়াশিংটন। ১৯৭৯ সালের তাইওয়ান সম্পর্ক আইন; যাতে তাইওয়ানকে আত্মরক্ষায় সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেয় ওয়াশিংটন। ১৯৮২ সালের ছয়টি প্রতিশ্রুতির একটি ছিলো- তাইওয়ানের উপর চীনের সার্বভৌমত্বকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেবে না যুক্তরাষ্ট্র।
আরও পড়ুন: বিতর্কিত সফর শেষে পেলোসির তাইওয়ান ত্যাগ
এক চীনা নীতিতে তাইওয়ান চীনের অংশ। যুক্তরাষ্ট্র, এক চীনা নীতি স্বীকার করে। তবে তাইওয়ানের বিষয়টি অমীমাংসিত।
পেলোসির সফর পরবর্তীতে কী হতে পারে?
বেইজিং রেনমিন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক শি ইয়িনহং বলেছেন, দুই অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে নানা বিষয়ে দ্বন্দ্ব রয়েছে। পেলোসির সফর সিনো-মার্কিন সম্পর্কে আরো অবনতি হয়েছে। তবে চীন এখনো পর্যন্ত তুলনামূলক সংযম দেখিয়েছে। এ মুহূর্তে সর্বাত্মক সশস্ত্র সংঘাতের সম্ভাবনা কম।
পেলোসির দ্বীপ ছাড়ার পর তাইওয়ানের চারপাশে সামরিক মহড়ার করতে যাচ্ছে চীনা বাহিনী। যা কোনোভাবেই শক্তি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মুখোমুখি দাঁড়ানো নয়, বলেছেন শি ইয়িনহং।
আর মোক বলেছেন, চীন এখন যা করতে পারে তা হলো, যুক্তরাষ্ট্রকে আর্থিকভাবে শাস্তি দেয়া। যেমন এক বা দুই সপ্তাহের জন্য চিপ সরবরাহ বন্ধ রাখা। এমনটা করলে যুক্তরাষ্ট্রের বিরাট ক্ষতি হয়ে যাবে। এছাড়া, তাইওয়ানে প্রবেশে বাধা তৈরি করা। পিপলস লিবারেশন আর্মি দিয়ে তাইওয়ানে প্রবেশ এবং বের হওয়া বন্ধ করে দেয়া।
একাত্তর/আরএ