বিশ্বে বেড়েই চলেছে মাঙ্কিপক্সের প্রকোপ। এরইমধ্যে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৫০ হাজার ৪৯৬ জন ছাড়িয়েছে। এ ভাইরাসে বিশ্বে এখন পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ১৬ জনের।
রোগটি কিভাবে ছড়ায়, এটি কাকে সংক্রমিত করে এবং এটি কতটা মারাত্মক -এসব প্রশ্ন নিয়ে অনেকেরই ভুল ধারণা রয়েছে। অতীতে এই ধরনের ভুল বোঝাবুঝির কারণে অনেকে স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়েছে, অনেকে সতর্কতা অবলম্বন না করে বিষয়গুলো এড়িয়ে গেছে এবং টিকা না নেয়ারও সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির এপিডেমিওলজিস্ট ডক্টর জর্জ সেলিনাসের মতে, জনস্বাস্থ্যের জরুরি অবস্থার সময় সবচেয়ে খারাপ জিনিসগুলোর মধ্যে একটি হলো ভুল তথ্য। অন্যদিকে নির্ভুল তথ্য মানুষকে তাদের ব্যক্তিগত ঝুঁকি বুঝতে সাহায্য করতে পারে এবং প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ নিতে উৎসাহী করে তোলে।
এই এপিডেমিওলজিস্ট আরও বলেন, এসব রোগ থেকে বাঁচতে আমাদের বিজ্ঞানের সাথে থাকতে হবে।
অণুবীক্ষণ যন্ত্রে মাঙ্কিপক্স
যুক্তরাষ্ট্রের অনলাইন সংবাদমাধ্যম দ্য হাফিংটন পোস্ট শনিবার মাঙ্কিপক্স নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি তথ্য দিয়েছে। এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন ডক্টর জর্জ সেলিনাস নিজেই।
সংবাদমাধ্যমটি বলছে, এই পাঁচটি তথ্য মানুষকে মাঙ্কিপক্সের ঝুঁকি থেকে দূরে রাখবে।
১. মাঙ্কিপক্স শুধুমাত্র যৌনতার মাধ্যমে ছড়ায়?
মাঙ্কিপক্স যৌন সংক্রামিত সংক্রমণ হিসাবে বিবেচিত হয় না। এটি প্রাথমিকভাবে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভাইরাসটি শুধুমাত্র যৌনতার মাধ্যমে ছড়ায় না।
মাঙ্কিপক্স সংক্রমণের জন্য ত্বক থেকে ত্বকের যোগাযোগ প্রয়োজন -যা যৌনতার মাধ্যমে বা যৌনতা ছাড়াই ঘটতে পারেন। আলিঙ্গন করা, একই বিছানা ব্যবহার বা অন্যান্য বস্তুতে স্পর্শ করার ফলেও যে কেউ মাঙ্কিপক্সের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
'মাঙ্কিপক্সে আক্রান্ত হওয়ার জন্য কি যৌনতা আবশ্যক?' এ প্রশ্নের জবাবে সেলিনাসের সরাসরি উত্তর, না!
২. মাঙ্কিপক্স এবং করোনা কি একই ধরনের ভাইরাস?
এ বিষয়ে সেলিনাস বলেন, মাঙ্কিপক্স এবং করোনা এক নয়। মাঙ্কিপক্স অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাস নয়।
করোনার মতো মাঙ্কিপক্সও ধ্বংসযজ্ঞ ঘটাতে সক্ষম, এমনটা মনে করেন না তিনি।
তিনি বলেন, আমি বলছি না মাঙ্কিপক্স নিয়ন্ত্রণ করা সহজ, তবে এটি ততটা কঠিন নয়।
মাঙ্কিপক্সের টিকা
৩. মাঙ্কিপক্স শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে প্রভাবিত করে?
মাঙ্কিপক্স প্রাথমিকভাবে পুরুষদের সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপনকারী পুরুষদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু সমকামী নয় এমন ব্যক্তিদের মধ্যেও এটি একইভাবে ছড়ায়। তবে একাধিক যৌন সঙ্গী রয়েছে এমন লোকেদের জন্য এটি বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।
ভাইরাসটি কাকে সংক্রামিত করবে সেটি যৌন সম্পর্কের উপর নির্ভর করে না।
সেলিনাস বলেন, এ ভাইরাসটি ত্বক থেকে ত্বকের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তিতে যেতে পারে। এক্ষেত্রে ব্যক্তিটির কার্যকলাপ বা লিঙ্গ গুরুত্বপূর্ণ নয়।
৪. মাঙ্কিপক্স কি একটি নতুন রোগ?
বিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি নতুন কোনো রোগ নয় এবং করোনার থেকেও এ রোগে সৃষ্টি হয়নি। ১৯৫০ এর দশকের শেষের দিকে এই রোগটি প্রথম আফ্রিকায় শনাক্ত হয়েছিল এবং কিছু পশ্চিম ও মধ্য আফ্রিকান দেশে এটি স্থানীয়ভাবে দেখা দিয়েছিল।
সেলিনাস বলছেন, ভাইরাসটি এখনও সেভাবে সংক্রমণযোগ্য হয়নি। তবে এটি দীর্ঘকাল ধরে রয়েছে। ১২৫টি দেশে এই রোগ ছড়িয়ে পড়েছে।
৫. মৃত্যুর হার কম হওয়ায় মাঙ্কিপক্স কি কম ঝুঁকিপূর্ণ?
এপিডেমিওলজিস্টরা বলছে, সাধারণভাবে মাঙ্কিপক্সে খুব কম লোক মারা যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে এখন পর্যন্ত মাঙ্কিপক্সে আক্রান্ত কারো মৃত্যু হয়নি।
অন্যদিকে ভারত এবং স্পেনসহ আফ্রিকার বেশ কিছু দেশে এ ভাইরাসে মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু এ ভাইরাসে মৃত্যুর হার এক শতাংশেরও কম। ফলে ভাইরাসটিকে খুব মারাত্মক বলতে রাজি নন সংশ্লিষ্টরা।
মাঙ্কিপক্সে আক্রান্ত বেশিরভাগ লোককে হাসপাতালে ভর্তি করার দরকার হয় না। যদিও রোগটি সাধারণত প্রাণঘাতী নয়, তবুও এটি বিপজ্জনক হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে ক্ষত সৃষ্টির পাশপাশি প্রস্রাব এবং মলত্যাগের ক্ষেত্রে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, হোম কোয়ারেন্টাইন এবং টিকা গ্রহণের মাধ্যমে ভাইরাসটির মৃত্যু ঝুঁকি আরও কমিয়ে আনা সম্ভব।
কোয়ারেন্টাইন
এর আগে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডাব্লিউএইচও) প্রকাশিত এক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, বিশ্বের ১২৫টি দেশে এই রোগ ছড়িয়ে পড়েছে।
মাঙ্কিপক্স রোগীর সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়েছে এমন দেশগুলো হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, স্পেন, ব্রাজিল, ফ্রান্স, জার্মানি, ব্রিটেন, পেরু, কানাডা ও নেদারল্যাণ্ডস। এসব দেশে যথাক্রমে ১৭ হাজার ৯৯৪, ছয় হাজার ৫৪৩, চার হাজার ৬৯৩, তিন হাজার ৫৪৭, তিন হাজার ৪৬৭, তিন হাজার ৪১৩, এক হাজার ৪৬৩, এক হাজার ২২৮ এবং এক হাজার ১৬০ জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন।
আরও পড়ুন: জাপোরিঝিয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিকিরণ বিপর্যয়ের শঙ্কা
মাঙ্কিপক্সের জন্য নির্দিষ্ট কোন ভ্যাকসিন নেই। তবে গুটিবসন্তের টিকা নেওয়া থাকলে, তা মাঙ্কিপক্স থেকে ৮০ শতাংশ সুরক্ষা দেয়। কারণ দুটি ভাইরাস অনেকটা একই ধরনের।
মাঙ্কিপক্সে আক্রান্তদের মধ্যে জ্বর, মাথাব্যথা, ফুসকুড়ি, র্যাশের মত উপসর্গ দেখতে পাওয়া যায়। মুখ থেকে শুরু হয়ে শরীরের বাকি অংশে ছড়িয়ে পড়ে এই র্যাশ।
একাত্তর/আরবিএ