পৃথিবীর দ্বিতীয় গভীরতম নীল গহ্বরের খোঁজ

বড়ই্ বিচিত্র পৃথিবীর প্রকৃতি। এর জল-স্থলে আর আকাশে লুকিয়ে আছে অপার সব বিষ্ময়। যার কোন শেষ নেই। এমনই এক বিষ্ময়ের নাম ব্লু হোল বা নীল গহ্বর। একটি নীল গহ্বর হলো এক ধরনের বিশাল সামুদ্রিক গুহা বা সিঙ্কহোল। যার উপরিভাগ খোলা ও বৃত্তাকার। চারিদিক ঘিরে থাকে প্রবাল প্রাচীর। আর খাড়াভাবে অনেক গভীর। বিশ শতকের শেষ দিকে সৌখিন ডুবুরি দল আর মাছ শিকারীরা প্রথম এই নীল গহ্বরের খোঁজ দেন পৃথিবীর মানুষকে। 

বড়ই রহস্যময় এই নীল গহ্বর। প্রাগৈতিহাসিক কালে তৈরি এসব প্রাকৃতিক বিস্ময়ের রহস্যভেদ অবশ্য করেছে মানুষ। অদম্য কৌতুহল, দুর্দমনীয় সাহস আর অভিযানের নেশা মানুষকে বারবার নিয়ে গেছে দুর্ভেদ্য অরণ্যে। এবারও তার অন্যথা হয়নি। খুঁজে পেয়েছে আরও একটি নীল গহ্বর। তবে মানুষ যতই রহস্যভেদ করুক, প্রকৃতির খেয়ালের সামনে তার বিস্ময়ের ঘারে কাটে না। রূপের মধ্যে তাই চলতেই থাকে অরূপের সন্ধান।

সেই ধারায় এবার বিজ্ঞানী ও গবেষক দল আবিস্কার করলেন পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম নীল গহ্বর। বলা হচ্ছে এই আবিস্কার ভিনগ্রহের জীবন সম্পর্কে একটি বিশাল জ্ঞান ‘শূন্যতা’ পূরণ করতে সহায়ক হবে। বিজ্ঞানীদের এই আবিস্কার দারুণ করে বিষ্মিত করেছে। তারা মনে করছেন, মেক্সিকো উপকূলে এই নীল গহ্বর পথ দেখাবে অন্য গ্রহে বসবাসের উপায় খুঁজতে। 

ব্লু হোল বা নীল গহ্বরকে আদর করে বলা হয় সমুদ্রের নীলকান্তমণি। মেক্সিকোর নীল গহ্বরটির খোঁজ পাওয়া গিয়েছিলো ২০২১ সালেই। কিন্তু সেটি নথিভুক্ত হয়েছে সম্প্রতি। বৈজ্ঞানিক জার্নাল ফ্রন্টিয়ার্স ইন মেরিন সায়েন্সে নথিভুক্ত করা হয়েছে সবশেষ এই নীলকান্তমণিকে। মেক্সিকোর ইউকাটান উপদ্বীপের উপকূল ঘেষেই এই বিশাল গহ্বরের খোঁজ মিলেছে। সমুদ্রের নীচে এই বিশাল গহ্বরটির আয়তন এক লক্ষ ৪৭ হাজার বর্গফুট। আর গভীরতা ৯০০ ফুট। 


চেতুমাল উপসাগরের বুকে খোঁজ পাওয়া এই সামুদ্রিক গুহাই এখন বিশ্বের দ্বিতীয় গভীরতম ‘নীল গহ্বর’। এটিকে আপাতত ডাকা হচ্ছে ‘তাম জা’ বলে। মায়া সভ্যতার ভাষায় যার অর্থ হলো ‘গভীর জল’। এই গহ্বরে কোনও অক্সিজেন নেই। তা ছাড়া পানির রং এতোই গাঢ় যে, সূর্যের আলো পানি  করে গহ্বরের গভীরে পৌঁছতে পারে না। অক্সিজেনবিহীন গহ্বরের নীচে কোনও প্রাণ আছে কি না, তার খোঁজ চালাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। তারা রীতিমতো উচ্ছ্বসিত এই নীল গহ্বর নিয়ে। 

সমুদ্রের বুকে এই বিশাল গহ্বরের সৃষ্টি হল কী ভাবে? ডিসকভারি ডটকম প্রতিবেদন বলছে, এই এলাকায় চুনাপাথরের ভাগ বেশি। সমুদ্রের নীচেও চুনাপাথর রয়েছে। পানির সংস্পর্শে এসে সেই পাথর ক্ষয়ের কারণে ধীরে ধীরে বিশাল গহ্বরের চেহারা নিয়েছে। এই গহ্বরের পানি গাঢ় নীল ও কালচে। মূলত এক ধরনের ব্যাকটেরিয়ার কারণে জলের রং খুবই গাঢ়। আকাশ থেকে এই গহ্বরটি দেখলে একটি সাধারণ জলাভূমি বলে ভুল হতে পারে।


মেক্সিকোর গভীর জলে অক্সিজেনের পরিবর্তে বিষাক্ত গ্যাস হাইড্রোজেন সালফাইড। ফলে সঠিক  সঠিক সরঞ্জাম ছাড়া অতল গহ্বরে যাওয়া মানুষের পক্ষে বিপজ্জনক হবে। তবে গহ্বরটির পানিতে অক্সিজেন না থাকায় এটিকে আর্শীবাদ হিসাবে দেখছেন বিজ্ঞানীরা। কারণ, এর ফলে গহ্বরের প্রাচীর ও অতলে থেকে যাওয়া জীবাশ্মের পচন রোধ করছে। এসব জীবাশ্ম থেকে প্রাণের অনেক অজানা তথ্য বের করতে আশাবাদী বিজ্ঞানীরা। 

দক্ষিণ চীন সাগরে এমনই একটি বিশাল ‘নীল গহ্বর’ রয়েছে। যেটির গভীরতা ৯৮৭ ফুট। যার নাম নাম ‘ড্রাগন হোল’। এটির অবস্থান বিতর্কিত প্যারাসেল আইল্যান্ডসের মাঝখানে। শত শত বছর ধরে এই ড্রাগন হোলের কথা জানা থাকলেও এর গভীরতা মাপা গেছে সম্প্রতি। এরিমধ্যে এই নীল গহ্বরে পাওয়া গেছে ২০ প্রজাতির মাছ। তবে এদের সবার বাস ওপরের দিকে। কারণে এই গহ্বরের ৩০০ ফুটের নিচে কোন অক্সিজেন নেই। বিজ্ঞানীরা মনে করেন এসব নীল গহ্বরের গঠন শুরু হয়েছে বরফ যুগ থেকে। ফলে পৃথিবীর সৃষ্টির অনেক রহস্য লুকিয়ে আছে এমন ধরনের নীল গহ্বরে। সেই রহস্য ভেদের আরও সুযোগ এনে দিলো সবশেষ মেক্সিকোর ‘গভীর জল’।


একাত্তর/আরবিএস