ট্রেন দুর্ঘটনা এড়াতে রেল সুরক্ষা ব্যবস্থায় অত্যাধুনিক প্রযুক্তি চালু করেছিলো ভারতের রেল মন্ত্রণালয়। গত বছর থেকে ঘটা করে তার প্রচার করা হয়েছিল। স্বয়ং রেলমন্ত্রী ওই প্রযুক্তির ট্রেনে চেপে পরীক্ষামূলক ভ্রমণও করেছিলেন।
তবে ওড়িশায় তিন ট্রেনের সংঘর্ষে প্রায় ৩০০ মানুষের মৃত্যুর পর অজস্র প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছে ‘কবচ’ নামের এই প্রযুক্তি।
শুক্রবার সন্ধ্যায় বালেশ্বরের কাছে বাহানগা বাজারে লাইনচ্যুত হয় চেন্নাইগামী করমণ্ডল এক্সপ্রেসের ১৫টি বগি। একই সঙ্গে দুর্ঘটনাগ্রস্ত হয় বেঙ্গালুরু-হাওড়া সুপার ফাস্ট এক্সপ্রেস এবং একটি মালগাড়িও।
এই তিন ট্রেনের দুর্ঘটনায় বালেশ্বর এখন মৃত্যুপুরী। এখন পর্যন্ত ২৮৮ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, আহত হয়েছেন ৯ শতাধিক মানুষ।
‘কবচ’ হলো মূলত একটি সংঘর্ষবিরোধী প্রযুক্তি। দু’টি ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষ এর মাধ্যমে এড়ানো যায়। দেশটির রেল কর্তৃপক্ষের দাবি, এই প্রযুক্তি দুর্ঘটনাশূন্য রেল পরিষেবার জন্ম দেবে।
এই দুর্ঘটনার পর থেকেই ‘কবচ’ নিয়ে অনেক প্রশ্ন উঠেছে, যার উত্তর খুঁজছে গোটা ভারত। রেলের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি কি ব্যর্থ হয়েছে করমণ্ডল এক্সপ্রেসে, এমন প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই।
আদৌ এই দুই ট্রেন এবং মালগাড়িতে ‘কবচ’ প্রযুক্তি ছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
২০১২ সাল থেকে ‘কবচ’-এর নির্মাণপ্রক্রিয়া চলছে। ২০১৪ সালে প্রথম এই প্রযুক্তির পরীক্ষামূলক প্রয়োগ করা হয়। এর মাধ্যমে রেল দুর্ঘটনার সম্ভাবনা অনেকটাই কমে আসবে বলে দাবি করেছিল কর্তৃপক্ষ।
২০২০ সালে ‘কবচ’কে জাতীয় স্বয়ংক্রিয় ট্রেন সুরক্ষা ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সর্বোচ্চ সুরক্ষা স্তরের পরীক্ষাতেও সবুজ সংকেত পায় এই প্রযুক্তি। তবে যাত্রীবাহী ট্রেন ছাড়া মালবাহী ট্রেনে ‘কবচ’ পদ্ধতি ব্যবহার করা হবে, এমন কোনও পরিকল্পনাও এখনও রেলের নেই।
রেল জানিয়েছে, ‘কবচ’ প্রযুক্তিতে রয়েছে মাইক্রো প্রসেসর, গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম এবং রেডিও সংযোগব্যবস্থা। যাবতীয় আধুনিক প্রযুক্তি ‘কবচ’-এ ব্যবহার করা হয়েছে।
মূলত, একই লাইনের উপর দু’টি ট্রেনের উপস্থিতি নির্দিষ্ট দূরত্ব থেকেই বুঝতে পারে ‘কবচ’। সেই অনুযায়ী সে আগেভাগে ট্রেনের চালককে সতর্ক করে দেয়।
দু’টি ট্রেন একই লাইনে চলে এলে ইঞ্জিনে বসানো একটি যন্ত্রের মাধ্যমে অনবরত সিগন্যাল দিতে থাকে ‘কবচ’। যা চালকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করেন তিনি।
রেল জানিয়েছে, ‘কবচ’ শুধু সতর্কই করে না। এই প্রযুক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ট্রেনের গতিবেগ কমিয়ে দেয় এবং এর ফলে চালকের হস্তক্ষেপ ছাড়াই ট্রেনের ব্রেক কার্যকর হয়। এই পদ্ধতির আর একটি সুবিধা হল, নেটওয়ার্ক পদ্ধতিতে ট্রেন চলাচলের গতিবিধির উপর সরাসরি নজর রাখা যায়।
২০২২ সালের মার্চ মাসে ‘কবচ’ ট্রেনকে দুর্ঘটনা থেকে বাঁচাতে পারে কি না, তার পরীক্ষা চলছিল। সেই পরীক্ষামূলক যাত্রায় একটি ট্রেনে ছিলেন স্বয়ং রেলমন্ত্রী। দু’টি লোকো একই লাইনে পরস্পরের দিকে ছুটে যায়।
কিন্তু তাদের অব্যর্থ পরিত্রাণ দিয়েছিল ‘কবচ’। ধাক্কা লাগার আগেই একটি ইঞ্জিন অপরটির চেয়ে ৩৮০ মিটার দূরত্বে থেমে গিয়েছিল। কোনও দুর্ঘটনা ঘটেনি। তার ভিডিও টুইটারে পোস্ট করে রেলমন্ত্রী বৈষ্ণব জানান, পরীক্ষা ১০০ শতাংশ সফল।
করমণ্ডল এক্সপ্রেস কিংবা বেঙ্গালুরু-হাওড়া সুপারফাস্ট এক্সপ্রেসে আদৌ ‘কবচ’ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছিল কি না, তা এখনও নিশ্চিত নয়। তাই ‘কবচ’ নিয়ে অনেক রকম প্রশ্নের মুখে রেল।
হাওড়া থেকে দক্ষিণ ভারতগামী ট্রেনগুলোর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ করমণ্ডল এক্সপ্রেস। দক্ষিণ ভারতে চিকিৎসার জন্য হোক কিংবা নিছক পর্যটন, বহু মানুষ এই ট্রেনের উপর ভরসা করে থাকেন।
গুরুত্বপূর্ণ এই ট্রেনে ‘কবচ’ প্রযুক্তি থাকাই স্বাভাবিক। সে ক্ষেত্রে, প্রযুক্তি থাকা সত্ত্বেও কেন দুর্ঘটনা এড়ানো গেল না, সেই প্রশ্ন উঠেছে। রেলের প্রযুক্তির যোগ্যতাও সে ক্ষেত্রে প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়েছে।
কিন্তু যদি ‘কবচ’ না থাকে, তা হলেও রেলের নিস্তার নেই। এত গুরুত্বপূর্ণ ট্রেনে কেন ‘কবচ’ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়নি, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
আরও পড়ুন: বালেশ্বরের দুর্ঘটনাস্থলে মমতা, যাচ্ছেন মোদিও
একইসঙ্গে প্রশ্নের মুখে বেঙ্গালুরু-হাওড়া সুপারফাস্ট এক্সপ্রেসও। ওই ট্রেনেও ‘কবচ’ ব্যবহার করা হয়েছিল কি না, স্পষ্ট নয়। মালগাড়িতেও ‘কবচ’ ব্যবহার করা হয়েছিলো কিনা, তাও জানা যায়নি।
দুর্ঘটনাগ্রস্ত দু’টি ট্রেনেই আধুনিক এবং নিরাপদ এইচএলবি কোচ ব্যবহার করা হয়েছিল। এই ধরনের কোচ লাইনচ্যুত হলে কাপলিং আলগা হয়ে দু’পাশে ছড়িয়ে পড়ে। শুক্রবারের দুর্ঘটনায় সেই বৈশিষ্ট্যই মারাত্মক হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন অনেকে।
একাত্তর/এসজে