অবরুদ্ধ গাজায় ইসরাইলি বিমান হামলায় গত ২৪ ঘণ্টায় ২০১ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। হামলায় আহত হয়েছেন আরও ৩৬৮ জন। এ নিয়ে ইসরাইলি হামলায় মৃতের সংখ্যা পৌঁছেছে ২০ হাজার ২৫৮ জনে।
আর আহত হয়েছেন ৫৩ হাজার ৬৮৮ ফিলিস্তিনি। শনিবারের হামলায় একটি যৌথ পরিবারের ৭৬ জন সদস্য নিহত হয়েছেন। মানবিক সঙ্কট চরমে পৌছেছে সেখানে।
মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহ এলাকার আল-সায়েদা খাদিজা স্কুলের ভেতরে অস্থায়ী ক্লিনিকে দিনরাত কাজ করছেন ফিলিস্তিনি সার্জন বাশির আল হোউরানি। সারাদিনই বোমার আঘাত নিয়ে ভিড় করছে রোগীরা।
তার ভাষায়, অনেক রোগীর হাসপাতালে থাকার কথা ছিলো। কিন্তু কোন হাসপাতালেই তিল ধারণের ক্ষমতা নেই। বাধ্য হয়ে তারা আসছে স্কুলে বসানো এই অস্থায়ী ক্লিনিকে।
চিকিৎস হোউরানি জানান, শুধু গজ আর আয়োডিন ছাড়া চিকিৎসা দেয়ার মতো কিছুই নেই সেখানে। অথচ জরুরি চিকিৎসা ছাড়া বাঁচানো যাবে না এমন অনেকেই ক্লিনিকটিতে রয়েছে।
সার্জন বাশির বলেন, ব্যান্ডেজ করে দেয়ার পরদিন সেটি খুলে দেখছি ক্ষতস্থানে ইনফেকশন হয়ে যাচ্ছে। গুরুতর আহতদের আলাদা রাখার জায়গা নেই। চেয়ে চেয়ে আহতদের মরতে দেখছি।
মেডিসিন্স স্যান্স ফ্রন্টিয়ার্স নামের একটি আন্তর্জাতিক মেডিকেল এজেন্সি এক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে জানিয়েছে, গাজার দক্ষিণাঞ্চলের খান ইউনিসের নাসের হাসপাতালের ভেতর পা রাখার জায়গা নেই।
চিকিৎসকরা মরদেহ মাড়িয়ে ছুটে যাচ্ছে অন্য মুমূর্ষু শিশুদের সাহায্যে। রাফাহ শহরে ইসরাইলি বোমায় ঘর আর পরিবার হারিয়েছেন ওয়াইল ধাইর। ইট, বালির ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে তার সাজানো সংসার।
ওয়াইল ধাইর বলেন, সীমান্ত খুলে না দিলে মানুষ না খেয়ে মরবে। কোথাও কোন খাবার নেই, কোন আটা, তেল, পানি নেই। কিছুই নেই। বর্বরতার এই মাত্রা কল্পনাও করা যায় না।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে মিশর সীমান্ত দিয়ে কিছু ত্রাণ সামগ্রী গাজায় প্রবেশ করেছে। কিন্তু বোমা হামলা অব্যাহত থাকায় শুধু সীমান্ত লাগোয়া কিছু জায়গাতেই পৌঁছানো গেছে ত্রাণ। সংঘাত ও মানবিক সঙ্কট যেখানে সবচেয়ে বেশি, সেখানে খাবার,পানি বা ওষুধ কিছুই পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না।
দুই শতাধিক ফিলিস্তিনি যোদ্ধাকে গ্রেপ্তারের দাবি
ফিলিস্তিনের গাজা থেকে গত এক সপ্তাহে হামাস ও ইসলামিক জিহাদের দুইশ যোদ্ধাকে গ্রেপ্তারের দাবি করেছে ইসরাইল। গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাদের ইসরাইলের ভূখণ্ডে নেয়া হয়েছে।
শনিবার ইসরাইলের প্রতিরক্ষা বাহিনী ও দেশটির গোয়েন্দা সংস্থা শিন বেতের যৌথ একটি বিবৃতিতে এ দাবি করা হয়। আইডিএফ দাবি করছে, গত ৭ অক্টোবর গাজায় হামলা শুরুর পর থেকে ৭০০ ফিলিস্তিনি যোদ্ধাকে গ্রেপ্তার করেছে তারা।
গণমাধ্যম বিবিসি বলছে, ইসরাইলের প্রতিরক্ষা বাহিনী ও গোয়েন্দাদের করা এই দাবির সত্যতা তাদের পক্ষে যাচাই করা সম্ভব নয়। তবে এ মাসের শুরুতে তারা একটি ভিডিও চিত্রের সত্যতা যাচাই করেছিল। সেই ভিডিও চিত্রে গাজার উত্তরাঞ্চলে কয়েক ডজন ফিলিস্তিনিকে বন্দী দেখা যায়।
জিম্মিদের ফিরিয়ে আনার দাবিতে বিক্ষোভ
গাজায় হামাসের হাতে আটক জিম্মিদের মুক্ত করে আনার দাবিতে তেল আবিবে হাজার হাজার মানুষ বিক্ষোভ করেছে। তেল আবিবের প্রধান চত্ত্বর ছাড়াও হাবিমা স্কয়ারেও বিক্ষোভ হয়েছে।
শনিবারের এ বিক্ষোভে হামাসের হাতে বন্দি অনেক ইসরাইলির স্বজনরা অংশ নিয়েছেন। বিক্ষোভকারীদের মধ্যে বেশিরভাগই ছিলেন গাজায় ইসরাইলি বন্দিদের বন্ধু এবং পরিবারের সদস্য। এ সময় তারা অবিলম্বে বন্দিদের ফিরিয়ে আনার দাবি জানান।
গাজায় হামাস ও ইসরাইলের মধ্যে অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির মধ্যে প্রায় ১০০ জন জিম্মিকে মুক্তি দেয়া হয়েছে। এখনো হামাসের হাতে জিম্মি রয়েছে আরো অন্তত ১৩০ জন। গত ৭ অক্টোবর ইসরাইলে হামলা চালিয়ে ২৪০ জনকে জিম্মি করে গাজায় নিয়ে যায় হামাস।
ইসরাইলের বিরুদ্ধে ইরানের যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নীরবতা ও ব্যর্থতায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরাইলি যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি। রোববার রাজধানী তেহরানে এক সমাবেশে দেওয়া ভাষণে এই অভিযোগ করেছেন তিনি। ইব্রাহিম রাইসি বলেন, ফিলিস্তিনিদের আত্মরক্ষার অধিকার রয়েছে।
ইরানি প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতি অন্যায়ের প্রতিক্রিয়া হিসেবে ইসরাইলি ভূখণ্ডে অপারেশন আল-আকসা ফ্লাড চালিয়েছে হামাস। গত ৭ অক্টোবর ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী গোষ্ঠী হামাসের ওই হামলা তাদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে বলে মন্তব্য করেন রাইসি। তিনি বলেন, ফিলিস্তিন সঙ্কটের সঠিক সমাধান হল ফিলিস্তিনি জনগণকে তাদের ভাগ্য নির্ধারণের সুযোগ করে দেওয়া।