মধ্যপ্রাচ্যের তিন মাসব্যাপী রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে একদিকে যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নজিরবিহীন ও ঐতিহাসিক কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে, অন্যদিকে তখন মাঠ পর্যায়ের বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ ধারণ করেছে। সোমবার ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং ইরান-সমর্থিত লেবানিজ সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর সাথে তাঁর অত্যন্ত ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে; যা লেবাননে একটি টেকসই যুদ্ধবিরতির আশা জাগিয়েছে।
তবে এই আশাবাদের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সোমবার সন্ধ্যায় দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলি বাহিনীর ব্যাপক বোমাবর্ষণ এবং সেখানে থাকা ইসরাইলি সেনাদের ওপর হিজবুল্লাহর পাল্টা হামলা অব্যাহত ছিল।

এর আগে, ইরানের আধাসরকারি সংবাদ সংস্থা 'তাসনিম' জানিয়েছিল, ইসরাইল তাদের সেনাদের লেবাননের আরও গভীরে প্রবেশের নির্দেশ দেয়ায় আমেরিকার সাথে চলমান পরোক্ষ শান্তি আলোচনা স্থগিত করেছে তেহরান। এনবিসির এক সাংবাদিক এই বিষয়ে ট্রাম্পের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি জানান, আলোচনা স্থগিতের ব্যাপারে ইরানের পক্ষ থেকে তিনি অফিসিয়ালি কিছু শোনেননি।
এরপরই ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন সতর্কবার্তা জারি করে বলে, লেবাননে হিজবুল্লাহর ওপর ইসরাইলি হামলা যদি এভাবে চলতে থাকে, তবে গত এপ্রিলের শুরু থেকে আমেরিকার সাথে কার্যকর থাকা তাদের নিজস্ব ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতিটি খুব দ্রুতই ভেঙে পড়বে। যদিও ইরানি কর্মকর্তারা এই বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি, তবে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সোমবার গভীর রাতে পুনর্ব্যক্ত করেছে যে, যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের সমস্ত দায় আমেরিকাকেই নিতে হবে।

আমেরিকার কোনো প্রেসিডেন্ট এর আগে কখনো হিজবুল্লাহর সাথে এভাবে যোগাযোগ করেননি, কারণ ওয়াশিংটন হিজবুল্লাহকে একটি ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করে রেখেছে। তবে সেই প্রথা ভেঙে ট্রাম্প তাঁর নিজস্ব সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে একটি পোস্টে লেখেন, প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সাথে আমার অত্যন্ত ফলপ্রসূ কথা হয়েছে। বৈরুতে কোনো ইসরাইলি সেনা যাচ্ছে না এবং যারা সেদিকে অগ্রসর হচ্ছিল, তাদেরও ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। একইভাবে, উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিদের মাধ্যমে হিজবুল্লাহর সাথেও আমার চমৎকার আলোচনা হয়েছে এবং তারা সব ধরণের গোলাগুলি বন্ধ করতে সম্মত হয়েছে। তবে এই বিষয়ে ইসরাইলের তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
নেতানিয়াহু অবশ্য সোমবার বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলীয় হিজবুল্লাহ ঘাঁটিতে বিমান হামলার নির্দেশ দেন, যা গত এপ্রিলের মাঝামাঝি সময় থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধবিরতির পর ইসরাইল বেশ কয়েকবার করেছে। তবে মাঠের লড়াইয়ে ইসরাইলি সেনারা ইতিমধ্যেই সীমান্ত থেকে লিতানি নদী পর্যন্ত দক্ষিণ লেবাননের একটি বিশাল অংশ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে এবং সেখান থেকে আরও ১০ কিলোমিটার উত্তরে জাহরানি নদীর দিকে অগ্রসর হচ্ছে; যা গত ২৫ বছরের মধ্যে লেবাননের ভেতরে ইসরাইলের সবচেয়ে গভীরতম অনুপ্রবেশ।

এদিকে লেবাননের প্রেসিডেন্ট কার্যালয় থেকে জানানো হয়েছে, হিজবুল্লাহ আমেরিকার একটি প্রস্তাবে রাজি হয়েছে যার অধীনে পুরো লেবানন ভূখণ্ডে পারস্পরিক হামলা বন্ধ থাকবে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, হিজবুল্লাহর এই যুদ্ধবিরতির প্রতিশ্রুতি শুধু লেবাননের অভ্যন্তরে কার্যকর হতে পারে, উত্তর ইসরায়েলে নয়; যেখানে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকেও হিজবুল্লাহ ক্রমাগত রকেট ও ড্রোন হামলা চালিয়ে আসছে। ট্রাম্পের এই আকস্মিক ও নাটকীয় মধ্যস্থতা মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধক্ষেত্রে কতটা শান্তি ফেরাতে পারবে, তা নিয়ে এখন বিশ্বজুড়ে চলছে টানটান উত্তেজনা।
