খান ইউনিসে চলছে হত্যাযজ্ঞ, যুদ্ধবিরতি অনিশ্চিত

ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় দখলদার ইসরাইলি বাহিনীর অবিরাম হামলায় সেখানে নিহতের সংখ্যা বেড়ে প্রায় সাড়ে ২৫ হাজারে দাঁড়িয়েছে। আহত হয়েছে আরো ৬৩ হাজারের বেশি মানুষ। যাদের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। এখন পরিস্থিতির মধ্যেই গাজার দক্ষিণে খান ইউনিস শহরকে ঘিরে ফেলে একের এক এক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসারাইলি ‘হায়েনা’ আইডিএফ।

বুধবার ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গাজার খান ইউনিস শহরে হামলায় আরো কমপক্ষে ৪০ জন নিহত হয়েছে। হামলা হয়েছে আশ্রয় শিবিরে। সেখানে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে জাতিসংঘের শরনার্থী বিষয়ক সংস্থা। চলমান হামলার মধ্যেই খান ইউনিসের চার বর্গ কিলোমিটার এলাকা থেকে প্রায় ৯০ হাজার বাসিন্দা এবং সোয়া চার লাখ বাস্তুহারা লোকজনকে সরে যেতে বলেছে ইসরাইল।

এই বিপুল পরিমাণ বেসামরিক নাগরিক গাজার অন্য সব শহর থেকে খান ইউনিসে আশ্রয় নিয়েছিলেন। কিন্তু গাজার কোনো স্থানই এখন আর নিরাপদ নয়। বিশেষ করে খান ইউনিসে এখন হামলা আরো বাড়িয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। এর পাশপাশি গাজার উত্তরেও হামলা অব্যাহত রেখেছে ইসরাইল। সেখানের জাবালিয়াতে বিমান হামলায় ১২ জন নিহতের খবর দিয়ে আল জাজিরা টেলিভিশন।

অক্সফাম একটি এলাকায় দুটি গুদামে হামলার নিন্দা করেছে। তারা বলেছে, গুদামগুলোকে নিরাপদ এলাকা হিসাবে ঘোষণা করেও ইসরাইল হামলা চালিয়েছে। গাজার দক্ষিণের শহর খান ইউনিসের পশ্চিমে অবস্থিত এই দুই গুদামে সাম্প্রতিক দিনগুলিতে আক্রমণ করা হয়েছে, বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোকে তাদের তাঁবু এবং অস্থায়ী আশ্রয়ে হত্যা করেছে। এ ধরনের হামলার বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সংস্থাটি।

এদিকে, টাইমস অব ইসরাইল বুধবার জানিয়েছে, তেল আবিবের দেয়া দুই মাসের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে রাজি হয়নি হামাস। আপাতত এক মাসের যুদ্ধবিরতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা চলছে দুই পক্ষের মধ্যে। এই যুদ্ধবিরতি শেষে স্থায়ীভাবে সংঘাত নিরসনের নিশ্চয়তা চেয়েছে হামাস। তবে স্থায়ীভাবে গাজার সংঘাত নিরসনের সম্ভাব্য উপায় নিয়ে দুই পক্ষের দ্বিমতের কারণে এখনো এই পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়নি।

কাতার, ওয়াশিংটন ও মিশরের উদ্যোগে এ পর্যায়ের আলোচনা শুরু হয় ২৮ ডিসেম্বর থেকে। প্রায় এক মাস ধরে চলমান এ আলোচনায় বেশিরভাগ বিষয়ে একমত হতে সমর্থ হয়েছে দুই পক্ষ। প্রাথমিকভাবে এক মাস যুদ্ধবিরতির দিকে এখন নজর দেয়া হচ্ছে। হামাস শুরুতে 'কয়েক মাস' যুদ্ধবিরতির দাবি করেছিল। এরপর হামাস শর্ত দেয়, স্থায়ী যুদ্ধবিরতিতে ঐক্যমত ছাড়া, তারা এ ধরনের সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে রাজি হবে না।

ইসরাইল চলতি সপ্তাহে দুই মাস যুদ্ধবিরতির একটি প্রস্তাব হামাসের কাছে পাঠায়। এই প্রস্তাবে জিম্মি ও বন্দি মুক্তির পাশাপাশি গাজায় অবস্থানরত ইয়াহিয়া সিনওয়ারসহ হামাসের জ্যেষ্ঠ নেতাদের নিরাপদে অন্য কোনো দেশে চলে যেতে দেওয়ার কথা বলা হয়। এরপর হামাস শর্ত দেয়, স্থায়ী যুদ্ধবিরতির বিষয়ে ঐক্যমত প্রতিষ্ঠা না হলে তারা এ ধরনের সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে রাজি হবে না। এতে আবার বেকে বসেছে তেল আবিব।

হামাসের হাতে বন্দি ১৩৬ জন জিম্মির মুক্তির বিনিময়ে এই যুদ্ধবিরতি দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছে ইসরাইল। এতে প্রথম ধাপে নারী-শিশু, ৬০ বছরের বেশি বয়সী ও গুরুতর অসুস্থ জিম্মিদের মুক্তি দিতে হবে। পরের ধাপে সব নারী সেনা ও ৬০ বছরের চেয়ে কম বয়সী বেসামরিক পুরুষ, নারী সেনা ও নিহত জিম্মিদের মরদেহ হস্তান্তর করতে হবে। এরআগে ইসরাইলি কারাগারে বন্দি ফিলিস্তিনিদের মুক্তির বিষয়টি চূড়ান্ত হবে।

প্রস্তাবে ইসরাইল স্পষ্ট করে বলেছে, তারা স্থায়ীভাবে যুদ্ধ বন্ধ করবে না। তবে গাজার প্রধান শহরগুলো থেকে ইসরায়েলি সেনার সংখ্যা কমিয়ে আনা হবে ও হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত গাজার উত্তরাঞ্চলের বাসিন্দাদের ধীরে ধীরে বসতবাড়িতে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হবে। তবে হামাস বলেছে, স্থায়ী যুদ্ধবিরতি নিয়ে দুই পক্ষ একমত না হলে তারাও এই প্রস্তাবে পক্ষে সায় দিবে না।

হামাসের সাথে একটি সম্ভাব্য মধ্যস্থতা চুক্তি ইসরাইল সরকারের মুখপাত্র ইলানা স্টেইন পিছিয়ে দিয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তার অধীনে গাজায় পণবন্দীদের মুক্তির বিনিময়ে যুদ্ধ বন্ধের কথা ছিল। ইলানা এক ব্রিফিংয়ে বলেন, যুদ্ধবিরতি চুক্তির বিষয়ে মন্তব্য করে হামাসের ধ্বংস এবং সব জিম্মিকে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে হাল ছেড়ে দেবে না ইসরাইল। গাজা থেকে ইসরাইলের প্রতি কোনো নিরাপত্তা হুমকি থাকবে না।

তিনি আরো বলেন, কোনো যুদ্ধবিরতি হবে না। অতীতে মানবিক উদ্দেশে বিরতি ছিল। সেই চুক্তি হামাস লঙ্ঘন করেছে। তবে আলোচনার সঙ্গে যুক্ত সূত্রগুলো বলছে, ইসরাইলি মুখপত্র ইলানা স্টেইনের বক্তব্য তেল আবিবের কী-না তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। তবে একথা ঠিক যে, যুদ্ধবিরতির শর্ত নিয়ে ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে তীব্র বনিবনি হচ্ছে। বারবার আলোচনার পথ এদিক-সেদিকে ঘোরাঘুরি করছে।

এদিকে গাজা যুদ্ধের সমাধান নিয়ে আলোচনা করতে তুরস্কে পৌঁছেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি। সেখানে তিনি তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের সাথে এনিয়ে আলোচনা করবেন। ইরানি নেতা বিমানে ওঠার আগে বলেছিলেন, ফিলিস্তিনি জনগণ ও নিপীড়িতদের প্রতিরোধের সমর্থনে ইরান ও তুরস্কের অভিন্ন অবস্থান রয়েছে। দুই নেতা মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত বন্ধের উপায় নিয়েও আলোচনা করবেন।

অন্যদিকে, চীন বলেছে দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধান হল ফিলিস্তিন ও ইসরাইলের জন্য শান্তি অর্জনের একমাত্র কার্যকর উপায় এবং নিরাপত্তা পরিষদের প্রাসঙ্গিক প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের জন্য অবশ্য প্রয়োজনীয়। মঙ্গলবার জাতি সংঘে চীনের স্থায়ী প্রতিনিধি চাং চুন নিরাপত্তা পরিষদের একটি উচ্চ পর্যায়ের উন্মুক্ত বিতর্কে বলেন, ইসরাইলি নেতৃত্বে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান প্রত্যাখ্যান করার বিষয়টিও অগ্রহণযোগ্য।