মিয়ানমার কেন বিশ্বের সবচেয়ে বাজে সরকার?

২০২১ সালের চার ফেব্রুয়ারি। তিন বছর আগের এদিন সকালে মিয়ানমারের মানুষরা ঘুম থেকে উঠে দেখতে পেলো তাদের সাধের প্রিয় গনতন্ত্র জানালা দিয়ে পালিয়ে গেলো। অং সাং সুচির গণতান্ত্রিক সরকারকে হটিয়ে আবারও দেশটির শাসন দখল করে নেয় মিয়ানমারের জান্তারা। জারি করে সামরিক শাসন। এরপর থেকেই দেশটি কেবলই ভূতের মতো পেছনের দিকে হাঁটতে শুরু করে। 

গেলো তিন বছরে মিয়ানমারের জান্তা সরকারের হাত শুধু রক্তরঞ্জিতই হয়নি, সেসঙ্গে বিশ্বের সবচেয়ে বাজে সরকারের তকমাও জুটিয়েছে। ‘সন্ত্রাসবিরোধী’ অভিযানের নামে ৪ হাজার ৪৭৪ বেসামরিক নাগরিককে হত্যা; আর গ্রেফতার করেছে ২৫ হাজারেরও বেশি। এছাড়াও এ সময়ে ৭৮ হাজারের বেশি বড়িঘর পুড়িয়ে দিয়েছে জান্তাবাহিনী। দেশ ছাড়া করেছে লাখো লাখো মানুষকে, যাদের বড় অংশের আশ্রয় এখন বাংলাদেশে। 

এ তো গেলো দেশটির মানবিক দৃশ্য, সেই সঙ্গে অর্থনীতি থেকে বাণিজ্য, বাজার ব্যবস্থা, কৃষি, চিকিৎসাসহ সব ক্ষেত্রেই ধুকছে মিয়ানমার। এতে করে দেশটি জুড়ে ছড়িয়েছে সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট। দেখা দিয়ে জান্তা বিরোধী সশস্ত্র আন্দোলন। জান্তাবিরোধী মনোভাবকে কাজে লাগিয়ে দেশটির বিদ্রোহী সব গোষ্ঠি এখন একাট্টা। সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানিয়ে মিয়ানমার সেনাদের কাছ থেকে দখলে নিয়ে বহু এলাকা। 

পাকিস্তান-আফগানিস্তানের মতো মিয়ানমারও এখন বৈশ্বিক ক্ষুধার ‘হটস্পট’। জাতিসংঘের হিসাবে দেশটির প্রতি চারজনের একজন খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। সেই সঙ্গে গ্লোবাল পিস ইনডেক্স জানাচ্ছে, সামরিক শাসনের অধীনে মিয়ানমার এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সবচেয়ে বিপজ্জনক দেশগুলোর মধ্যে ১৮তম স্থানে রয়েছে। এর জন্য অনেকগুলো কারণও চিহ্নিত করে দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। 

দেশটির জনগণ যখনই গতন্ত্রণের দাবি জানিয়েছে, তখনই দেশটির জান্তা সরকার তাদের উপর স্টিমরোলার চালিয়েছে। হাজার হাজার মানুষকে জেলে ঢুকিয়েছে, এই হিসাবে, এবছরের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত মিয়ানমারে ১৯ হাজার ৯৯৩ রাজনৈতিক বন্দি কারাগারে আটক আছেন। এর মধ্যে ৩ হাজার ৭৮০ জন নারী। এত বিপুল সংখ্যক কারাবন্দি কখনও দেখেনি দেশটির কোন গণতান্ত্রিক সরকার। 

উর্দি পোশাকে যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং গণহত্যা করে প্রধানমন্ত্রীসহ দেশটির সব শীর্ষ পদেই আছেন তারা। তাদের কুকর্মের কথা যাতে কেউ জানতে না পারে, তাই মিডিয়ার বিরুদ্ধেও খড়গ হস্ত হয়েছে জান্তারা। কঠোর সেন্সরশীপ ছাড়াও বহু সাংবাদিককে হত্যার পাশাপাশি জেল-জুলুম চলছে। সিপিজে তথ্য  জানাচ্ছে, গত বছর অর্থাৎ ২০২৩ সালে ৪৩ গণমাধ্যমকর্মীকে গ্রেফতার করেছে জান্তা সরকার।

জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর অনুসারে, চলতি বছরের ১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মিয়ানমারে ২৬ লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। তাদের মধ্যে ২৩ লাখেরও বেশি মানুষকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করা হয়েছে। এছাড়াও ৭০ হাজারের বেশি মানুষ নিরাপত্তার কারণে প্রতিবেশি দেশগুলোতে শরণার্থী হিসাবে আশ্রয় চেয়েছেন। বাংলাদেশেই বর্তমানে ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা আছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল জানাচ্ছে, ২০২৩ সালের দুর্নীতি উপলব্ধি সূচকে ১৮০টি দেশের মধ্যে মিয়ানমার ১৬২তম। এতে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে উত্তর কোরিয়াকেও পেছনে ফেলেছে দেশটি। অথচ সেনা শাসনের আগে দৃশ্যপট ছিলো অনেকটাই আশা জাগানিয়া। । আবার নিজ দেশে অস্ত্র তৈরি করে নিজ দেশের নাগরিককে হত্যা করা বিরল দেশের একটি হলো মিয়ানমার।

এসব নানা কারণে বিশ্বের সবচেয়ে বাজে সরকারের তকমা জুড়ে যাবার পরও নির্বিকার জান্তারা। উর্দি বেশে দেশটির শাসনক্ষমতা ধরে রাখতে চাইছে তারা। আবারও জরুরি অবস্থার সময় ছয় বাড়িয়েছে তারা। তবে, বিশ্লেষকরা বলছেন, জান্তা ও থ্রি এলায়েন্স মধ্যে চলতে থাকা গৃহযুদ্ধ এখন চরম অবস্থায়। তিন মাসে বিভিন্ন অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ হারানো বড় হুমকির মুখে পড়েছে জান্তা সরকার।