জলদস্যুতা নির্ভর যে দেশের অর্থনীতি!

বাংলাদেশসহ বিশ্বের বেশিরভাগ দেশের কাছেই সোমালিয়া একটি গরীব রাষ্ট্র। তবে সোমালিয়ানরা শক্তিশালী এবং ভয়ংকর। লোহিত ও আরব সাগর ঘেঁষে অবস্থিত পৃথিবীর অন্যতম দস্যু রাষ্ট্র এই দেশ। দেশটির নাম শোনামাত্রই ভেসে আসবে সমুদ্রগামী জাহাজ লুটপাট, নাবিকদের অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়ের মতো দুর্ধর্ষ সব কর্মকাণ্ডের ছবি। তবে এই সোমালিরাই এক সময় ছিলো নিরীহ-সাদাসিদে। শস্য উৎপাদন এবং মাছ ধরেই জীবিকা নির্বাহ করতো দেশটির নাগরিকরা। কালে কালে ভয়ংকর দস্যুবৃত্তিতে জড়িয়ে পড়েছে এরাই। 

সোমালিদের এই দস্যুতার নেপথ্যের কারণই বা কি? কী এমন ঘটেছে যে হতদরিদ্র দেশটি জলদস্যুতার বীভৎস থাবায় বদলে গেল? জেলে পরিবার থেকে আসা মানুষগুলো মেতে উঠলো রক্তের হোলিখেলায়। চলুন জেনে নেয়া যাক নিরীহ মানুষগুলোর ভয়ংকর দস্যুতায় জড়িয়ে পড়ার পেছনের ইতিহাস। 

সোমালিয়ার জলদস্যুতা মূলত উপকূলে অবৈধভাবে মাছ ধরার ফলেই সৃষ্টি হয়েছিলো। বিদেশি জাহাজ থেকে এই উপকূলের পানির মধ্যে বিষাক্ত বর্জ্য ডাম্পিং করায় স্থানীয়দের পরিবেশ বসবাসের জন্য হুমকি হয়ে উঠেছিল। এর প্রতিবাদে সশস্ত্র দলে বিভক্ত হয়ে বিদেশি জাহাজ এ অঞ্চলে প্রবেশ বন্ধ করার চেষ্টা করে স্থানীয় জেলেরা । তবে ১৯৯৫ সালে একদিন আচমকাই একটি জাহাজের দখল নেয় জেলেরা। তাদের ছেড়ে দেয়ার বিনিময়ে ক্ষতিপূরণ নেয়ার একটি ঘটনাই বদলে দিল সাধারণ জেলেদের। তাড়িয়ে দেয়ার চেয়ে জব্দ করে ক্ষতিপূরণ কিংবা মুক্তিপণ আদায় করা যে বেশ সহজ, সেটিও পছন্দ হয়  উপকূলের জেলেদের। 

মাছ ধরার বদলে একে একে আধুনিক অস্ত্র, গোলাবারুদ, সাজসরঞ্জাম হাতে তুলে নেয় তারা। ছোট ছোট নৌকাগুলোর সঙ্গে ইঞ্জিন জুড়ে বদলে দেয়া হয় শক্তিশালী আক্রমণকারী রণতরীতে। অর্থের লোভে তাদের সাথে যুক্ত হয় সাবেক সেনাসদস্য এবং প্রযুক্তিবিদরা। যুদ্ধের কলাকৌশল সম্পর্কে জ্ঞান থাকায় সেনাসদস্যদের জায়গা হয় আক্রমণের অগ্রভাগে। আর, অত্যাধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ ও বাণিজ্যিক জাহাজের রাডার ফাঁকি দিতে সাহায্য করে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞের দল।

আক্রমণের সময় হিসেবে তারা মূলত রাত কিংবা ভোরের দিকটাকেই বেছে নেয়। জলদস্যুরা বড় জাহাজগুলোর কাছে পৌঁছাতে ছোট ছোট মটর চালিত নৌকা ব্যবহার করত। যা দ্রুত গতির পাশাপাশি বড় জাহাজের রাডারে সহজে ধরা পড়ে না। সমুদ্র বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান ও দক্ষতার কারণে সোমালিয়ান জলদস্যুরা এতটা সংঘবদ্ধ আক্রমণ করতে পারে। কেবল ক্ষিপ্র গতিতেই নয় বরং আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে হানা দেয় তারা। আক্রমণের সময় হিসেবে তারা মূলত রাত কিংবা ভোরের দিকটাকেই বেছে নেয়। 

বড় জাহাজগুলোর কাছে পৌঁছাতে ছোট ছোট মটর চালিত নৌকা ব্যবহার করে দস্যুরা। যা দ্রুত গতির পাশাপাশি বড় জাহাজের রাডারে সহজে ধরা পড়ে না। সাধারণত জাহাজগুলোর পেছন দিক থেকে আক্রমণ চালায় দস্যুরা। এক মাথায় হুক লাগানো লম্বা দড়িতে চেপে তারা দ্রুত জাহাজে উঠে যায়। এই কাজগুলো দ্রুতগতিতে করে ফেলে তারা। যাতে ক্রুরা কিছু বুঝে ওঠা, কিংবা এলার্ম বাজানোর আগেই পরিস্থিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে পারে ডাকাতরা। এছাড়া গভীর সমুদ্রে আক্রমণ সাজানোর সময় একটি মাদারশিপ থেকে অভিযান পরিচালনা করে দস্যুরা।

গণমাধ্যমের দেয়া তথ্যমতে, জলদস্যুদের আছে আলাদা অস্ত্রভাণ্ডার। এর মধ্যে অন্যতম হলো একে ফোর্টি সেভেন, একেএম, টাইপ ফিফটি সিক্স, টিটি থার্টি থ্রি, পিকে, আরপিজি সেভেন ইত্যাদি। এছাড়া আরজিবি ফাইভ ও এফ ওয়ানের মতো শক্তিশালী হাতবোমারও ব্যবহার করে থাকে তারা। 

এবার আসা যাক কীভাবে এতো শক্তিশালী হলো সোমালি দস্যুরা। তাদের এতোটা শক্তির পেছনে আছে আরেকটি বিষয়, সেটা হচ্ছে সোচ্চার গ্যাং বাহিনী। দেশটির উত্তরাঞ্চলের গ্যালমাদাগ প্রশাসন দক্ষিণাঞ্চলের বিদ্রোহীদের সঙ্গে লড়াইয়ে জলদস্যুদের ব্যবহার করে থাকে। 

এমনকি সেখানকার সেনাবাহিনী, যৌথ সরকারের মন্ত্রী, নেতা ও বড় বড় ব্যবসায়ীরা এ লুটের টাকার ভাগ পেয়ে থাকেন। জলদস্যুদের কাছ থেকে পাওয়া মুক্তিপণের অর্থ দিয়ে উন্নয়নের সাথে সাথে সোমালিয়ায় ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার ঘটছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, জলদস্যুতা এখন সোমালিয়ার অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি।

মঙ্গলবার আরব আমিরাতে যাওয়ার পথে ভারত মহাসাগরে জলদস্যুদের কবলে পড়ে এমভি আবদুল্লাহ নামে বাংলাদেশি পতাকাবাহী একটি জাহাজ। সোমালিয়ান দস্যুদের হাতে জিম্মি জাহাজের ২৩ জন নাবিক। এরই মধ্যে ভয়ানক হুমকির খবর ভেসে আসছে জিম্মি জাহাজ থেকে। মুক্তিপণ না দিলে মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছে দস্যুরা।