জেলে বসেও দিল্লি শাসনে কেজরি, আইন কী বলে

আবগারি দুর্নীতি অর্থাৎ মদ নীতি কেলেঙ্কারির মামলায় বৃহস্পতিবার রাতে ভারতের কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রণালয়ের তদন্তকারী সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের (ইডি) হাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন রাজধানী নয়াদিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল। তবে গ্রেপ্তার হলেও দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী পদ থেকে ইস্তফা দেননি আম আদমি পার্টি (আপ) প্রধান। 

আপের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কেজরিওয়ালই নয়াদিল্লির মুখ্যমন্ত্রী থাকবেন।

এক প্রতিবেদনে আনন্দবাজার জানাচ্ছে, ভারতের ইতিহাসে অরবিন্দ কেজরিওয়ালই প্রথম মুখ্যমন্ত্রী, যিনি পদে থাকাকালীন দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেপ্তার হলেন। 

এর আগে ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেনকেও গ্রেপ্তার করে ইডি। জমি দুর্নীতি মামলায় তাকে গত ৩১ জানুয়ারি গ্রেপ্তার করা হয়। তবে গ্রেপ্তারের আগে হেমন্ত রাজভবনে গিয়ে রাজ্যপালের কাছে ইস্তফা দিয়েছিলেন তিনি। তার পর ইডি তাকে গ্রেপ্তার করে। ফলে মুখ্যমন্ত্রীর পদে থাকাকালীন হেমন্ত কেজরিওয়ালের মতো হননি।

তারও আগে ১৯৯৭ বিহারের ট্রেজারি এবং বিভিন্ন দফতরে অনিয়ম সংক্রান্ত মামলায় (যে মামলার সূত্রে পশুখাদ্য কেলেঙ্কারি প্রকাশ্যে আসে) গ্রেপ্তার হওয়ার আগে মুখ্যমন্ত্রী পদে ইস্তফা দিয়েছিলেন আরজেডির লালুপ্রসাদ যাদব। একইভাবে ২০১৪ সালে আয়ের সঙ্গে সঙ্গতিহীন সম্পত্তির মামলায় বেঙ্গালুরুর বিশেষ আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় ইস্তফা দিয়েছিলেন তামিলনাড়ুর তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী, অধুনা প্রয়াত এডিএমকে নেত্রী জয়ললিতা।

কিন্তু জেলের ভেতরে থেকে প্রশাসন চালানো সম্ভব কিনা, তা নিয়ে অনেকের মতো আপের একাংশের ভেতরেও সংশয় রয়েছে। এক্ষেত্রে ভারতের জেলে কী বিধি মানা হয়, সেই বিষয়েও একটা অস্পষ্টতা রয়েছে। কারণ, মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে জেলে যাওয়ার দৃষ্টান্ত অতীতে না থাকায়, এমন সুনির্দিষ্ট কোনো বিধিও নেই, যেখানে কাউকে জেল থেকে প্রশাসন পরিচালনায় বাধা দেওয়া হবে। 

আগেও দিল্লির আবগারি দুর্নীতি মামলাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন আপ নেতা মণীশ সিসৌদিয়া এবং সঞ্জয় সিংহ। তারা দু’জনেই বর্তমানে তিহাড় জেলে বন্দি। কেজরিওয়ালের মতো ‘হাই প্রোফাইল’ বন্দিকেও তিহাড়ে রাখা হতে পারে বলে জল্পনা শুরু হয়েছে। 

তিহাড় জেলের প্রাক্তন আইন বিষয়ক আধিকারিক সুনীল গুপ্ত এই প্রসঙ্গে জানিয়েছেন, জেল থেকে প্রশাসন পরিচালনা করা বেশ কঠিন কাজ। এক্ষেত্রে একাধিক অসুবিধার কথাও তুলে ধরেন তিনি।

জেলের ভিতর এক জন বন্দিকে কী কী নিয়মবিধি মেনে চলতে হয়, সে কথা উল্লেখ করে তিনি ‘এনডিটিভি’-কে বলেন, জেল থেকে সরকার চালানো সহজ কাজ নয়। কারণ, জেলের নিয়ম অনুযায়ী এক জন বন্দি সপ্তাহে দু’বার পরিবার পরিজন, বন্ধু এবং অন্যদের সঙ্গে দেখা করতে পারবেন।

এসব শর্ত মেনে মুখ্যমন্ত্রীর মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলানো বেশ কঠিন বলেই মনে করেন তিহাড়ের সাবেক এই আধিকারিক।

অসুবিধার কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি জানান, একজন প্রশাসনিক প্রধানকে বিভিন্ন বিষয়ে একাধিক বৈঠক করতে হয়, অধস্তন আধিকারিক এবং প্রশাসনিক কর্তাদের কাজ সরেজমিনে খতিয়ে দেখতে হয়। জেলে থেকে যা করা কার্যত অসম্ভব।

তবে দিল্লির লেফটেন্যান্ট গভর্নর পদাধিকার বলে যে কোনো বাড়িকে জেল বা সংশোধনাগার বলে ঘোষণা করতে পারেন। সেক্ষেত্রে আপ প্রধান লেফটেন্যান্ট গভর্নর ভিকে সাক্সেনার কাছে এই বিষয়ে আর্জি জানালে এবং তা মঞ্জুর করা হলে নিজের বাসভবন থেকেই প্রশাসন চালাতে পারবেন দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী।

বিশ্লেষকরা বলছেন, কেজরিওয়ালের ক্ষমতা সীমাবদ্ধ। তিনি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী। অন্যান্য অঙ্গরাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরা যে স্বাধীন ক্ষমতা ভোগ করেন, দিল্লি কিংবা পুদুচেরির মুখ্যমন্ত্রীর তা নেই। 

অন্যদিকে দিল্লিতে কেজরিওয়াল এবং কেন্দ্রের প্রতিনিধি লেফটেন্যান্ট গভর্নরের মধ্যে ক্ষমতার টানাপড়েন তো আছেই।  

সবশেষ গেলো বছরের ১১ মে ভারতের শীর্ষ আদালতের পাঁচ সদস্যের সাংবিধানিক বেঞ্চ সর্বসম্মতভাবে জানিয়েছিলো, আমলাদের রদবদল থেকে যাবতীয় প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রয়েছে দিল্লির নির্বাচিত সরকারের। তবে পুলিশ, আইনশৃঙ্খলা এবং ভূমি দফতর সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কেন্দ্রের হাতেই থাকবে।

১৯ মে আদালতের সেই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে অধ্যাদেশ জারি করে মোদি সরকার। অধ্যাদেশে বলা হয়, জাতীয় রাজধানী সিভিল সার্ভিসেস কর্তৃপক্ষ গঠন করা হবে। আমলাদের নিয়োগ এবং বদলির ব্যাপারে তারাই সিদ্ধান্ত নেবেন। 

এসময় আপসহ অন্য বিরোধী দলগুলো অভিযোগ করে যে, নির্বাচিত সরকারের ক্ষমতা খর্ব করতে সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তকেও উপেক্ষা করছে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার। তাছাড়া আপ সরকারের যে আবগারি নীতি নিয়ে এত বিতর্ক, এত অভিযোগ, সেই বিষয়ে প্রথম সিবিআই তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিলেন লেফটেন্যান্ট গভর্নর সাক্সেনাই। ফলে কেজরির পথ খুব একটা সহজ হবে না বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।