এফ-১৬ যুদ্ধবিমান কতোটা শক্তিশালী?

যুদ্ধে রাশিয়ার সমকক্ষ হতে, ইউক্রেন তাদের পশ্চিমা মিত্রদের কাছে আমেরিকার তৈরি এফ-১৬ মাল্টি-রোল ফাইটার জেটের মতো আধুনিক যুদ্ধবিমান চেয়ে আসছে। এরিমধ্যে এফ-১৬ যুদ্ধবিমান ইউক্রেনে পাঠানোর জন্য নেদারল্যান্ডস ও ডেনমার্ককে অনুমতি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সেই সঙ্গে জানিয়েছে, ইউক্রেনের পাইলটদের এফ-১৬ চালানোর প্রশিক্ষণ শেষ হলে ফাইটারগুলো ইউক্রেনের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

ধারণা করা হচ্ছে, নেদারল্যান্ডস তাদের ফাইটার বহর থেকে ২৪টি এফ-১৬ সরিয়ে নেবে এবং সেগুলোর জায়গায় আরো আধুনিক যুদ্ধবিমান দিয়ে বিমান বাহিনী সাজাবে। ডেনমার্কও তাদের বহরে থাকা ৩০টি এফ-১৬ বিমানের একটি অংশ সরিয়ে দেবে। ৫৪টি এফ-১৬ যুদ্ধবিমানের সবগুলোই ইউক্রেনকে দেয়া হবে কিনা, সেটা পরিষ্কার করেনি কোন দেশই। তবে, এটা পরিষ্কার যে, এফ-১৬ নিয়ে এক ধরনের উত্তেজনায় আক্রান্ত ভলোদিমির জেলনস্কির ইউক্রেন।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এফ-১৬ যুদ্ধবিমান পেলে কতটুকু লাভবান হবে ইউক্রেন, দেশটি কি পারবে রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে সমান তালে লড়তে?

biman1

পশ্চিমা সমর বিশেষজ্ঞরাই বলছেন, এফ-১৬ যে যুদ্ধের গতিপথ একেবারে বদলে দেবে, তা নিয়ে কিছু সন্দেহ আছে। বলছেন, বাড়তি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যুক্ত করবে হয়তো কিন্তু যুদ্ধের প্রকৃতি বদলাতে পারবে না। ন্যাটোর অন্যান্য দেশ এই এফ-১৬ সম্পর্কে যতটা অভিজ্ঞ, ঠিক ততটাই নবীশ ইউক্রেনের পাইলটরা।

এবার জেনে নেয়া যাক, এই অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান কতটা শক্তিশালী? এটি প্রথম তৈরি করা হয় ১৯৭০ এর দশকে। এফ-১৬ শব্দের চেয়ে দ্বিগুণ গতিতে চলতে পারে এবং আকাশে বা মাটিতে- যে কোন টার্গেটে হামলা করতে পারে। এফ-১৬ এর পর এর বহু অত্যাধুনিক মডেল এসেছে। সর্বশেষে মডেলটি হচ্ছে এফ-৩৫। কিন্তু এখনো এফ-১৬ ব্যাপকভাবেই ব্যবহৃত হয়।

এখন পর্যন্ত প্রায় চার হাজারের মত এফ-১৬ তৈরি করা হয়েছে। ‘এফ-১৬ ফাইটিং ফ্যালকন’ যুদ্ধবিমানকে পৃথিবীর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ফাইটার জেট হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ভূপৃষ্ঠে লক্ষ্যবস্তুতে নির্ভুলভাবে আঘাত করা ও আকাশে প্রতিপক্ষের বিমান ধ্বংস করায় পারদর্শিতার কারণে পাইলটদের কাছে জনপ্রিয় এটি। ধ্বংসাত্মক ক্ষমতার কারণে মার্কিন পাইলটরা এটিকে ‘ভাইপার’ নামে ডাকেন। ভাইপার এক ধরনের বিষাক্ত সাপ, কামড় দিলেই মৃত্যু নিশ্চিত।

biman2

আমেরিকান এয়ারফোর্সে এই মুহূর্তে ৭০০টি কার্যকর এফ-১৬ রয়েছে। ডেনমার্ক, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডসসহ অনেক দেশই এটি ব্যবহার করে। যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, এই ফাইটার নির্ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সম্ভব, এমন প্রেসিশন গাইডেড মিসাইল ও বোমা দিয়ে সজ্জিত করা যায়। এটি ঘণ্টায় দুই হাজার চারশ’ কিলোমিটার বেগে ছুটতে পারে। আকাশ থেকে আকাশে এবং আকাশ থেকে ভূমিতে হামলায় এফ-১৬ অপ্রতিরোধ্য।

একবার জ্বালানি নিয়ে এই বিমান যুতটুকু পথ পাড়ি দিতে পারে, একই ধরণের অন্য যে কোনো বিমানের তুলনায় তা সর্বোচ্চ। অর্থাৎ, যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিপক্ষের বিমানের চেয়ে বেশি সময় অবস্থান করতে পারে এটি। এফ-১৬ যুদ্ধবিমানগুলোর উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন রাডার ধেয়ে আসা মিসাইল শনাক্ত করতে পারে। বর্তমানে যে কোন বিপদ দেখতে পেলে নিচে কাজ করা গ্রাউন্ড টিম পাইলটদের মুখে মুখে সতর্ক করে দেয়।

biman3

একক ইঞ্জিনের বহুমাত্রিক এই সর্বাধুনিক যুদ্ধবিমান এফ-১৬ তৈরি করেছে লকহিড মার্টিন। মূলত অর্থ সাশ্রয়ী হালকা বহুমুখী ফাইটার হিসাবেই তৈরি করা হয় এফ-১৬। আরেক মার্কিন ব্যয়বহুল বিমান এফ-১৫কে সাহায্য করতেই এটি তৈরির পদক্ষেপ নিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। এফ ১৬ এর ‘নাইট ভিশন’ যথেষ্ট শক্তিশালী। অর্থাৎ রাতেও এটি একই শক্তিতে হামলা চালাতে পারে।

এফ-১৬ ফাইটারের অস্ত্র রাখার ক্ষমতাও অবিশ্বাস্য। কামান, ক্ষেপণাস্ত্র, বোমা সবরকম অস্ত্রই থাকে এতে। ২১ হাজার ২৮২ কেজি বোমা নিয়ে ওড়ার ক্ষমতা রয়েছে এটির। সেই সঙ্গে বহন করতে পারে অত্যাধুনিক সব মিসাইল। দুই ডানায় পাঁচটি মিসাইল রাখতে পারে এফ-১৬। এর বাঁ দিকের ডানায় থাকে একটি টোয়েন্টি এমএম ভালকান কামান। প্রতি মিনিটে ছয় হাজার রাউন্ড গুলি ছুড়তে পারে এই দাবনীয় কামান।

biman4

এর ককপিট অনেক উন্নত। রয়েছে মাল্টিফাংশনাল ডিসপ্লে। এর ফলে সুপার ইমপোজড রাডার ডেটা দেখতে পারেন পাইলট। এফ ১৬-এর রাডার অত্যন্ত শক্তিশালী। এই বিমানে ভার্টিকল স্টেবিলাইজার আছে। ৩৬০ ডিগ্রি ভিউ সম্ভব যুদ্ধের সময়ও। মাটিতে থাকা যেকোনও চলন্ত বস্তুকেও নিশানা করতে সক্ষম এই যুদ্ধবিমান।

১৯৭৬ সালে উৎপাদনের অনুমতি পাবার পর থেকে চার হাজার ছয়শ’ টিরও বেশি এফ-১৬ নির্মিত হয়েছে। তবে মার্কিন এয়ারফোর্স এখন আর এটি কেনে না। বিভিন্ন দেশের কাছে এর উন্নত সংস্করণ বিক্রি করা হয়। অন্তত ২৫টি দেশের বিমানবাহিনীতে এফ-১৬ রয়েছে। ২০১৫ সালের হিসাবে সামরিক সেবার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত বিশ্বের সর্বাধিক সংখ্যক ফিক্স-উইং বিমান এটি। আকাশপথে যুদ্ধের ক্ষেত্রে এফ-১৬ কে অন্যান্য যুদ্ধবিমানের চেয়ে এগিয়ে রাখেন বিশেষজ্ঞরা।

biman5

তবে এরপরও কথা আছে। অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমানগুলো অতিমাত্রয় প্রযুক্তিনির্ভর হলেও চালানোর দায়িত্ব কিন্তু একটি পাইলটকেই নিতে হয়। এক্ষেত্রে যথাযথ প্রশিক্ষণ নিতে হয় পাইলটকে। তার দক্ষতার উপরই নির্ভর করে যুদ্ধবিমানের সফলতা ও ব্যর্থতা। আ নির এনিয়ে ইউক্রেনকে এফ-১৬ দেয়ার বিষয়ে শঙ্কায় আছেন বিশেষজ্ঞরা।

তারা বলছেন, শুধু পাইলট ও মেকানিকদের প্রশিক্ষণ দিলেই হলো না, ইউক্রেনকে সামরিক কাঠামোরও উন্নতি আনতে হবে।