রাফাহ পরিস্থিতি ভয়ঙ্কর, ইসরাইল-হামাস মুখোমুখি

ইসরাইলের রাফাহ অভিযানের কারণে গোটা গাজা উপত্যকায় ত্রাণ কার্যক্রম কয়েক দিনের মধ্যে বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘ। হামাস যোদ্ধাদের সঙ্গে লড়াইয়ের শেষ ধাপ হিসাবে ইসরাইল রাফাহ অভিযান শুরুর যাবতীয় প্রস্তুতি শেষ করে আনার পর এই সতর্কতা জানালো জাতিসংঘ।

ইসরাইলের ট্যাংক ও সাঁজোয়া বহর এরিমধ্যে রাফাহ শহরের পূর্ব ও পশ্চিমকে বিভক্ত করা সড়কটি দখলে নিয়েছে। শহরটি পূর্ব অংশ ঘিরে রেখেছে। ওয়াশিংটন ও অন্যান্য মিত্রদের কঠোর হুঁশিয়ারির পরেও এই অভিযান এগিয়ে নেয়ার সব আয়োজন শেষ করে ফেলেছে ইসরাইলের প্রতিরক্ষা বাহিনী।

রাফাহ বাসিন্দারা শুক্রবার শহরের পূর্ব এবং উত্তর-পূর্বে প্রায় অবিরাম বিস্ফোরণ এবং ব্যাপক গুলি বিনিময়ের আওয়াজ শুনেছেন বলে জানিয়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে, সেখানে ইসরাইলের বাহিনী এবং হামাস ও ইরাক-সিরিয়াভিত্তিক ইসলামিক জিহাদের জঙ্গিদের মধ্যে তীব্র লড়াই চলছে।

হামাস দাবি করেছে, তাদের যোদ্ধা ও সহযোগীরা শহরের পূর্ব দিকের একটি মসজিদের কাছে ইসরাইলি ট্যাঙ্কগুলোতে অতর্কিতে হামলা চালিয়েছে। রাফাহ অভিযানে অংশ নিতে পূর্ব দিকের সীমান্ত থেকে বেশ কয়েক কিলোমিটার দূরে জড়ো হয়েছিলো ইসরাইলের ট্যাঙ্কগুলো।

israil1

বেসামরিক নাগরিকদের রাফাহের পূর্ব অংশ থেকে বের হয়ে যেতে নির্দেশ দিয়েছে ইসরাইল। হাজার হাজার মানুষকে শহরের বাইরে আশ্রয় নিতে বাধ্য করেছে। চলমান যুদ্ধের সময় গাজা উপত্যকার অন্যান্য অংশ থেকে পালিয়ে আসা দশ লাখেরও বেশি মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল ছিলো রাফাহ শহর।

ইসরাইল জানিয়েছে, হাজার হাজার হামাস যোদ্ধাদের নির্মূল করতে হলে তাদের রাফাহতে অভিযান চালানো ছাড়া অন্য কোন বিকল্প নেই। হামাস বলেছে, তারা ইসরাইলকে যুদ্ধে পরাজিত করবে। এরিমধ্যে যুদ্ধবিরতি নিয়ে কায়রোর শেষ প্রস্তাবও ভেস্তে গেছে। হামাসের শেষ প্রস্তাবও মেনে নেয়নি ইসরাইল।

জাতিসংঘের ত্রাণ সংস্থাগুলো জানিয়েছে, এরিমধ্যে ত্রাণের মজুদ ও সরবরাহ কমে এসেছে। সে সঙ্গে জ্বালানি ও খাদ্যের মজুদও কমে আসছে। ফলে কয়েক দিনের মধ্যে ত্রাণ কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে। গাজায় জাতিসংঘের ত্রাণ সমন্বয়কারী হামিশ ইয়াং বলেছেন, পাঁচদিন ধরে কোনো জ্বালানি ও মানবিক সাহায্য গাজা উপত্যকায় প্রবেশ করেনি এবং আমরা বন্দুকের নলের নিচে বসবাস করছি।

israil2

জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (ইউএনআরডব্লিউএ) জানিয়েছে, সোমবার থেকে গাজার দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর রাফাহ থেকে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার মানুষ পালিয়ে গেছে। স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, ফিলিস্তিনিরা বিপুল সংখ্যায় শহর ছেড়ে পালাতে শুরু করেছে।

শুক্রবার ইউএনআরডাব্লুএ এক্সে এক পোস্টে বলেছে, রাফায় ইসরাইলি বাহিনীর বোমাবর্ষণ জোরদার হওয়ার সাথে সাথে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি অব্যাহত রয়েছে। ইউএনআরডাব্লিউএ সতর্ক করে বলেছে, লোকজন নিরাপত্তার খোঁজে পালিয়ে গেলেও তাদের জন্য কোথাও নিরাপদ জায়গা অবশিষ্ট নেই।

হামিশ ইয়ং আরও বলেন, রাফাহর লোকজন খুব ক্লান্ত ও আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। শুক্রবার দেখলাম কেউ একজন গাধার পিঠে করে তাদের অস্থায়ী অস্থায়ী শৌচাগার সাথে নেওয়ার চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, এর মাধ্যমে মানুষ কতটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে তার কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়।

israil3

তিনি জানান, সাত মাস ধরে চলা যুদ্ধের ফলে জনগণের অবস্থা এতটাই অবনতির দিকে গেছে যে তারা হেঁটে স্থানান্তরিত হওয়ার মতো যথেষ্ট সবল নয়। হেঁটে যাওয়া ছাড়া বেশিরভাগের ক্ষেত্রে আর কোনো উপায়ও নেই। এদের মধ্যে শিশুরাও রয়েছে, রয়েছে বোমায় পঙ্গুত্ব বরণ করা এবং অপুষ্টিতে ভোগা মানুষ।

রাফাহর পশ্চিমে তেল আল-সুলতানের বাসিন্দা আবু হাসান রয়টার্সকে বলেন, এটি নিরাপদ নয়, সমস্ত রাফা নিরাপদ নয়, কারণ থেকে সব জায়গায় ট্যাংকের গোলা এসে পড়ছে। আমি চলে যাওয়ার চেষ্টা করছি কিন্তু আমার পরিবারের জন্য একটি তাঁবু কিনতে আমি দুই হাজার শেকেল জোগাড় করতে পারছি না।

israil4

ইসরাইলি ট্যাঙ্কগুলো ইতিমধ্যে দক্ষিণ থেকে পূর্ব রাফাহ বন্ধ করে দিয়েছে, গাজা ও মিশরের মধ্যে একমাত্র ক্রসিংটি দখল করে বন্ধ করে দিয়েছে। শুক্রবার সালাহউদ্দিন রোডের দিকে গাজা উপত্যকাকে ভাগ করে ‘রেড জোন’ ঘেরাও সম্পন্ন করেছে। যেখান থেকে তারা বাসিন্দাদের বের করে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছে।

বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন, আমাদেরকে যদি একাই দাঁড়াতে হয়, তাহলে আমরা একাই দাঁড়াব। প্রয়োজনে আমরা আমাদের নখ দিয়ে লড়াই করব। কিন্তু আমরা জানি আমাদের আঙুলের নখের চেয়ে অনেক বেশি কিছু আছে।

ইসরাইল রাফাহতে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালালে বাইডেন ইসরাইলকে সামরিক সহায়তা দেয়া বন্ধ করার হুমকি দেয়ার পরে নেতানিয়াহু এই মন্তব্যটি করলেন। এরইমধ্যে ইসরাইলকে বোমা সরবরাহ করা বন্ধ রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটন এখনও মনে করে, রাফাহতে বড় ধরনের অভিযান চালাবে না ইসরাইল।