মধ্যপ্রাচ্যের কসাই হিসাবে খ্যাত ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রতি একের পর এক তোপ দাগিয়ে যাচ্ছেন তুর্কি নেতা রিসেপ তাইয়েপ এরোদোয়ান। নেতানিয়াহুকে ‘কসাই’ হিসাবে অ্যাখায়িত করার পর গণহত্যাকারী বলেও গোটা বিশ্বজুড়ে গণমাধ্যমের শিরোনামে এসেছিলেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট।
ইসরাইলের প্রতিরক্ষা বাহিনী গাজার শেষ আশ্রয়স্থল হিসাবে বিবেচিত রাফাহ শহরে বড় আকারে অভিযান শুরু করার পর তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরোদোয়ান বলেছেন, তেল আবিবের কর্তা নেতানিয়াহু যেভাবে গাজা উপত্যকায় গণহত্যা চালাচ্ছেন, যে ধরনের নিষ্ঠুরতা দেখাচ্ছেন, তাতে হিটলারও লজ্জা পাবে।
১৯৪৯ সালে প্রথম মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হিসেবে ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিয়েছিলো তুরস্ক। তবে সাম্প্রতিক দশকগুলোতে দেশ দুটির মধ্যকার সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। ২০১০ সালে গাজায় তুর্কি জাহাজে ইসরাইলি কমান্ডোদের হামলায় দশ তুর্কি কর্মী নিহত হবার ঘটনায় তুরস্ক কূটনৈতিক সম্পর্কও ছিন্ন করে।
পরে, ২০১৬ সালে আবার দেশ দুটির মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনস্থাপিত হয়। কিন্তু এর দুই বছরের মাথায় আবারও দুই দেশ কূটনৈতিক বিতণ্ডতায় জড়িয়ে পরে। গাজা সীমান্তে ইসরাইলি সেনাদের হাতে ফিলিস্তিনি নিহত হবার ঘটনাকে কেন্দ্র করে উভয় দেশ একে অন্যের শীর্ষ কূটনীতিককে বহিষ্কার করে।
সেই থেকে আঙ্কারা-তেল আবিবের মধ্যে দা-কুমড়ো সম্পর্ক। গত সাত অক্টোবর ইসরাইলে হামাসের হামলার পর ইসরাইলের তীব্র সমালোচনা করে আসছেন এরোদোয়ান। তিনি বলেছিলেন, হামাসের হামলার জবাবে নেতানিয়াহু যে সামরিক অভিযান চালিয়েছেন তা ‘হিটলার যা করেছিলো তার চেয়ে কোন অংশে কম নয়’।
সম্প্রতি গাজায় ‘ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়’কে কারণ হিসেবে উল্লেখ করে ইসরাইলের সঙ্গে সব ধরনের বাণিজ্য স্থগিত করেছে তুরস্ক। দেশটির বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, ইসরাইল গাজায় ‘বাধাহীন ও যথেষ্ট পরিমাণ ত্রাণ প্রবাহ’ অনুমতি না দেয়া পর্যন্ত এ পদক্ষেপ বহাল থাকবে।
গাজা উপত্যকায়, ইসরাইলের অভিযানের মধ্যেই এরোদোয়ান ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন- হামাসের প্রধান ইসমাইল হানিয়াকে আতিথ্য দিয়েছেন। ইস্তাম্বুলের ডলমাবাহচে প্রাসাদে দুই নেতা দেখাও করেছেন। এসব নিয়ে ইসরাইল বা পশ্চিমাদের চোখ রাঙানিকে পাত্তাও দেননি তুরস্কের প্রেসিডেন্ট।
এরপরই গত ২৪ এপ্রিল আঙ্কারায় এক সংবাদ সম্মেলনে এরোদোয়ান বলেন, তুরস্ক এখন থেকে আর ঘাতক ইসরাইলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বাণিজ্য সম্পর্ক বজায় রাখবে না। সেই অধ্যায় পুরোপুরি শেষ হয়ে গেছে। এরপরই গেলো সপ্তাহে সব ধরণের বাণিজ্য স্থগিতের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয় তুরস্ক।
এছাড়া ইরানের হামলার জবাবে ইসরাইলের পাল্টা হামলার প্রস্তুতি নেয়ার সময়ও নেতানিয়াহু ও পশ্চিমাদের সমালোচনা করেন এরোদোয়ান। তিনি বলেছিলেন, আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিমারা ইসরাইলে ইরানের হামলার নিন্দায় ব্যস্ত, অথচ সিরিয়ায় ইরানের দূতাবাসে হামলার ঘটনায় চুপ ছিলো।
রোববার গ্রিসের ক্যাথিমেরিনি দৈনিকের সাথে একটি সাক্ষাৎকার এরোদোয়ান বলেন, গণহত্যায় নেতানিয়াহু এমন একটি স্তরে পৌঁছেছেন, নাৎসি নেতা হিটলারকে ঈর্ষান্বিত করতে পারে। ইসরাইল-হামাস যুদ্ধে তুরস্কের অবস্থান এবং নেতানিয়াহু সম্পর্কে তার পূর্বের মন্তব্য সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে একথা বলেন এরদোগান।
এরদোগান-নেতানিয়াহু একে অপরের উপর প্রকাশ্য আক্রমণের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। তেলআবিব-আঙ্কারা সম্পর্ক শীতল হবার সাথে সাথে এসব আক্রমণ আরও তীব্র হতে শুরু করে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এখন পর্যন্ত বাক লড়াইয়ে নেতানিয়াহুর থেকে অনেকটাই এগিয়ে রয়েছেন এরোদোয়ান।